পর্যটকদের পদচারনায় মুখর সিলেট
বিশেষ প্রতিনিধি: এবার ঈদে সিলেটের পর্যটন স্পট গুলোতে নেমেছিল বিনোদন প্রেমিদের ঢল। ঈদের দিন বিকেলের পর থেকে সরগরম হয়ে উঠে সিলেটের বিনোদন স্পটগুলো। শনিবার বিকেল পর্যন্ত লোকারন্য ছিল এসব পর্যটন স্পট। সিলেট থেকে জাফলং কিংবা বিছনাকান্দি যাওয়ার পথ সুগম নয়। ভাঙ্গাচোরা রাস্তার কারনে পর্যটকরা ওইসব এলাকায় যান না। কিন্তু ঈদে রাস্তা বাধা হয়ে দাড়াতে পারেনি। প্রকৃতির টানে হাজার হাজার মানুষ বেড়াতে ছুটে গেছেন এসব পর্যটনস্পটে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ ও জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিলেটের বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কঠোর। তবে, পর্যটকরা যাতে ঈদ উদযাপনে কোনো ধরনের বাধার মুখে না পড়েন সেটিও লক্ষ্য রাখা হয়।
প্রকৃতির খোলামেলা পরিবেশের কারনে মানুষের কাছে আকর্ষনীয় স্থান ছিল সিলেটের কাজীর বাজার ব্রিজ। উদ্বোধনের পর থেকেই যানবাহনের চেয়ে মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে ব্রিজটি। আর ঈদের ছুটিতে তো কথাই নেই। সুযোগ পেলেই মানুষ পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বন্ধব নিয়ে ঘুরতে আসছেন এখানে। আর সেই সাথে চলছে সেলফীবাজি। ঈদের দিন সহ তিনদিনই ব্রিজের প্রবেশমুখ থেকে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত মানুষের ভীড়। সবাই এসেছেন শান্ত বিকেলে সুর্যাস্ত আর কোমল পরিবেশ উপভোগ করার জন্য। আর মানুষের পদচারণা দেখে অনেক চটপটি আর ফুসকা ব্যবসায়ীরাও ভিড় করছেন সেখানে। বাদ পরেনি আইস ক্রীম, চটপটি-চানাচুর আর বাদাম ওয়ালারা। ভ্রাম্যমান চা ওয়ালা ছাড়াও ভ্যানগাড়ি দিয়ে চা বিক্রি করছেন অনেকে। আর ক্রেতাদের বসানোর জন্য চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে রেখেছেন এসব দোকানিরা। সব শ্রেনী পেশার মানুষ কাজিরবাজার ব্রিজে এসেছেন পরিবার নিয়ে ঘুরতে। আর আনন্দের মুহুর্তগুলোর স্মৃতি ধরে রাখতে তুলছেন একের পর এক ছবি। আর ছবি থেকে কেউই যাতে বাদ না পড়েন সেজন্যই তারা বেছে নেন সেলফী।
কাজিরবাজার ছাড়াও সিলেটের চাবাগানগুলোতেও ছিল পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। প্রতি বিকেলে হলেই চা-বাগানের ছায়াঘেরা গলিপথ হয়ে উঠে মানুষের পদচারনায় মুখরিত। একই সঙ্গে সিলেটের জাকারিয়া সিটি সহ কয়েকটি পার্কেও ছিল বিনোদন প্রেমিদের ভিড়।
‘সিলেটের সুন্দরবন’ খ্যাত বাংলাদেশের একমাত্র জলাবন (সোয়াম্প ফরেস্ট) হচ্ছে রাতারগুল। গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের গুয়াইন নদীর দক্ষিণে রাতারগুলের অবস্থান। সিলেট শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরত্বে এর অবস্থান। এই রাতারগুলে ঢল নেমেছে পর্যটকদের। এখন রাতাগুলে পর্যটনের মৌসুম। পানির উপরে ভাসমান জলাবনে হারিয়ে যেতে পরিবার নিয়ে দলবেধে মানুষ ছুটে যাচ্ছে রাতারগুলো। জলের মধ্যে ভেসে থাকা সবুজ বৃক্ষ, মাথার উপর তার ছায়া, সুনীল আকাশ, নৌকায় করে রাতারগুলে ঘুরে বেড়ানো তো অদ্ভূত রোমাঞ্চকর এক অ্যাডভেঞ্চারই! এই বনে কিছু সাপ ছাড়াও আছে বানর, মাছরাঙ্গা, পানকৌড়ি, কানা বক, সাদা বক, ঘুঘুসহ নানা জাতের অসংখ্য পাখি।
পর্যটকদের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠেছে সিলেটের জাফলংও। ঈদের দিন বিকেল থেকেই ভাঙ্গাচোরা সড়ক ডিঙ্গিয়ে হাজার হাজার পর্যটকরা ভিড় করছেন জাফলংয়ে। তবে, স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গেলো বারের চেয়ে এবার পর্যটকদের সংখ্যা কিছুটা কম। সুউচ্চ পাহাড়। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা বিশাল ঝর্ণা। নিচে সারি সারি পাথরের উপর ছিটকে পড়ছে ঝর্ণার স্বচ্ছ জল। পাহাড়, মেঘ, আকাশ আর স্বচ্ছ জলের জলকেলি মিলিয়ে বিছনাকান্দি মুগ্ধতার এক অনন্য রূপ। এই বিছনাকান্দি যাওয়ার রাস্তা এখন সহজ নয়। অনেকটা কঠিন। এরপরও ঈদের বাধখোলা আনন্দে পাহাড় বেয়ে নেমে আসা স্বচ্ছ পানিতে নিজেদের বিলিয়ে দিতে পর্যটকরা ভিড় করেছেন বিছনাকান্দিতেও।
কেউ বা প্রকৃতির টানে আবার কেউবা হযরত শাহজালাল (র.) ও শাহপরান(র.) এর মাজার জিয়ারতে ছুটে এসেছেন সিলেটে। হযরত শাহজালাল (র.) ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত দরবেশ-ওলিকুল শিরোমণি। সিলেট অঞ্চলে তার মাধ্যমেই ইসলামের প্রসার ঘটে। সিলেটের প্রথম মুসলমান শেখ বোরহান উদ্দিন (র.) এর ওপর রাজা গৌড়গোবিন্দের অত্যাচার এবং এর প্রেক্ষিতে হযরত শাহজালাল (র.) ও তাঁর সফরসঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার সিলেট আগমন ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তাই, সারাদেশের মানুষের শাহজালাল(র.) মাজার দেখার আগ্রহ ব্যাপক। পাশাপাশি সিলেটের দর্শনীয় স্থানগুলো নিজ চোখে দেখতে অগুণতি মানুষ ছুটে আসেন ৩৬০ আউলিয়ার দেশ সিলেটে।
শনিবার হযরত শাহজালাল (র.) মাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাজারের আশ-পাশে গাড়ির সারি সারি লাইন। স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেক গাড়ি পার্কিং করা হয়েছে নগরীর অন্যান্য পয়েন্টে। মাজার এলাকার ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সিলেটে প্রায় লক্ষাধিক লোক ঈদের ছুটি উপভোগ করতে এসেছেন। তারা জানান, মাজার এলাকার কোন হোটেলেই পর্যটকদের স্থান সংকুলান হচ্ছে না। সবকটি হোটেলের সিটই কানায় কানায় পূর্ণ। হোটেলে সিট না পেয়ে অনেকে রাস্তার পাশে, দোকানের সামনে অথবা তাদের ব্যবহৃত গাড়িতে বসে সময় কাটাচ্ছেন। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত সিলেটে কখনো থেমে থেমে আবার কখনো হালকা বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ কারণে হোটেলে স্থান না পাওয়া পর্যটকদের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। তবে, শনিবার বেলা বাড়ার সাথে সাথে বৃষ্টি কমতে থাকে। এ কারণে পর্যটকরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন।
নগরীর ওসমানী শিশু উদ্যান, ড্রিমল্যান্ড পার্কসহ সব বিনোদন পার্কগুলোতেই ছিল লক্ষণীয় ভিড়। ওসমানী শিশু উদ্যান ঘুরে দেখা যায়, সেখানে দর্শনার্থীদের প্রচন্ড ভিড়। অভিভাবকদের পাশাপাশি সেখানে শিশুদের ভিড় লক্ষ্যনীয়। পার্কের একজন কর্মী জানান, সকাল ৯টা থেকে খোলা হয় পার্ক। চালু থাকে রাত ১১টা-১২টা পর্যন্ত। দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে তারা অনেকটা পর্যুদস্ত বলে জানান ওই কর্মী।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সিলেটে এবারের ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের আগমন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ঈদের আগের দিন থেকেই দলে দলে আনন্দ পিপাসু লোকজন এসব স্পটে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
শহরতলীর মালনীচড়া চা-বাগানে রাজধানী ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা রনক আহমদ চৌধুরী শনিবার দুপুরে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে জানান, পাহাড়-টিলাঘেরা সিলেট যেন প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি। এবারই প্রথম সিলেটের সবুজ চা-বাগানগুলো প্রথম দেখতে এসেছি পরিবার পরিজন নিয়ে। কারণ এই স্থানগুলো শুধু টিভিতেই দেখেছি। সময় আর সুযোগের অভাবে এখানে আসা হয়নি। আর তাই, এবারের ঈদের ছুটির সুযোগ হাতছাড়া করিনি। এরই মধ্যে তিনি পরিবার নিয়ে জাফলং নিয়ে ঘুরে এসেছেন। তবে, হোটেলে সিট পেতে বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছে বলে জানান ওই ব্যাংক কর্মকর্তা।
বগুড়া থেকে ২০ জনের একটি তরুণ দল সিলেটে ঘুরতে এসেছে। তারা সবাই কলেজ ছাত্র। কয়েক বার সিলেট দর্শনের পরিকল্পনা করেও হয়নি। তবে, এবারের সুযোগ হাতছাড়া হয়নি। ঈদের আগের দিন তারা সিলেটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। তারা তামাবিল জিরো পয়েন্ট, শ্রীপুর পার্ক, লালাখাল, চেরাপুঞ্জি, পিয়াইন নদীর ওপর ঝুলন্ত সেতু, আদিবাসী খাসিয়া পুঞ্জি আর পাহাড় টিলার ঢেউ খেলানো চা বাগান দেখতে যাবে বলেও শনিবার এ প্রতিবেদককে জানিয়েছে।
চট্টগ্রাম থেকে বেড়াতে আসা লিমু-রফিক দম্পতির ৪ বছরের বিবাহিত জীবনের দ্বিতীয় সিলেট ভ্রমন এটি। সাদিয়া ইসলাম লিমু জানালেন, সিলেটের সৌন্দর্য যেন রং ধনুর সাত রঙের মতো। সিলেটের বর্ষাকে রবি ঠাকুরের অমর কবিতা ‘আজি ঝর ঝর মুখর বাদল দিনে আজি ঝর ঝর মুখর বাদল দিনে জানি নে জানি নেৃ.’-এর সাথে তুলনা করে বলেন, বাদল বিহীন দিনে সিলেটের প্রকৃতি যেন রুক্ষ মূর্তি ধারণ করে। আবার শীতের শুষ্কতায় অধিকাংশ গাছপালার পাতা ঝরে পড়ে। এ যেন সিলেটের অন্য রুপ।
সিলেটে বেড়াতে আসা অনেক পর্যটকের অভিযোগ-হোটেল-মোটেলে পর্যাপ্ত স্থান না থাকার অজুহাত দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে অধিক ভাড়া আদায় করছেন। এটা তাদের জন্য অস্বস্তিÍদায়ক বলে জানান তিনি।
দর্শনার্থীদের সাথে ভিন্ন মত প্রকাশ করলেন মাজার এলাকায় ছোট-বড় আবাসিক হোটেল ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিটি হোটেলেই আমরা কিছু না কিছু স্পেশাল আপ্যায়নের ব্যবস্থা রেখেছি। এ কারণে কিছু বেশী ভাড়া নেয়া হতে পারে। তবে, এ ব্যাপারে ঢালাও অভিযোগ ঠিক নয়।
Related News
এক ভিসায় যাওয়া যাবে মধ্যপ্রাচ্যের ৬ দেশে!
পর্যটন ডেস্ক: উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) ভুক্ত ছয়টি দেশে ভ্রমণের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত একক পর্যটনRead More
বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসা যাত্রা সহজ করতে মালয়েশিয়ার নতুন উদ্যোগ
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশি রোগীদের মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও সহজ ও রোগীবান্ধব করতে উদ্যোগRead More



Comments are Closed