Main Menu

সিলেটে ১৪ শহীদসহ ২২ তরুণের রক্তে রঞ্জিত হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান

Manual1 Ad Code

বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: ২০২৪ সালের আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ওঠে। জনতার অংশগ্রহণে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এই আন্দোলন।

বিশেষ করে ৪ ও ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্রজনতার আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে সিলেট। পুরো সিলেটজুড়ে মাঠে নেমেছিল জনতা।

Manual1 Ad Code

৪ আগস্ট নগরজুড়ে পুলিশের পাশাপাশি আগ্নেয়ান্ত্রের মহড়া দেয় ছাত্রলীগ। গুলি ছোড়া হয় ছাত্র-জনতার ওপর।

জুলাই-আগস্টের এই আন্দোলনে সিলেট জেলার মোট ২২ জন নিহত হয়েছেন এবং এখনো নিখোঁজ রয়েছেন একজন। যদিও সরকারি হিসেবে ১৪ জনের নাম শহীদের তালিকাভূক্ত হয়েছে।

শহীদের তালিকায় স্থান হয়নি সিলেটের কোতোয়ালি থানা কম্পাউন্ডে হত্যাকাণ্ডের শিকার সিএনজি অটোরিকশাচালক পঙ্কজ কুমার কর, গোয়াইনঘাটে নিহত কিশোরসহ তিনজন, লালাবাজারে নিহত স্বেচ্ছাসবক দল নেতা।

এছাড়া ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার বিজয় মিছিল থেকে দক্ষিণ সুরমা থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া অটোরিকশা চালক মোহাম্মদ শাহজাহানের নিখোঁজ রহস্য আজও উদঘাটন হয়নি।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে বিভাগের চার জেলায় ৩৩ শহীদের নাম তালিকায় আসে। এর মধ্যে সিলেটের ১৪ জন, হবিগঞ্জের ১৬ জন এবং সুনামগঞ্জের ৩ জন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি নিহত হন ৪ আগস্ট জেলার গোলাপগঞ্জে ৬ জন এবং সিলেটে কোতোয়ালি থানার সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত পাবেলও গোলাপগঞ্জের বাসিন্দা। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন আন্দোলনে অংশ নিয়ে তারা প্রাণ হারান। মিছিলে নির্বিচারে গুলিবর্ষণে শত শত ছাত্র-জনতাও আহত হন।

ফিরে দেখা রক্তাক্ত দিনগুলো:

Manual4 Ad Code

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় পুলিশ ধাওয়া করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত ছাত্রদের। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে খালের পানিতে ডুবে মারা যান শাবিপ্রবি’র ছাত্র রুদ্র সেন। এই আন্দোলনে তিনিই সিলেটে প্রথম শহীদ। পরদিন ১৯ জুলাই নগর যখন উত্তাল। বিএনপি ও তার অংগ সংগঠন বাদ যোহর কোর্ট পয়েন্ট থেকে জিন্দাবাজারের দিকে মিছিল নিয়ে রওনা হয়। তখন পেছন দিক থেকে পুলিশের এডিসি গোলাম কাওসার দস্তগীর কনস্টেবলের হাত থেকে আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নিয়ে গুলি ছোড়েন। সেই গুলিতে ঝাঝরা হয়ে যায় পেশাগত দায়িত্ব পালনে থাকা সাংবাদিক এটিএম তুরাবের শরীর। সহকর্মীরা তাকে বাঁচাতে প্রাণান্তর চেষ্টা করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন সন্ধ্যায় মৃত্যুবরণ করেন তুরাব। তার দেহে ৯৮ স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়।

এরপর বিভীষিকাময় আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা সিলেট। ৪ ও ৫ আগস্ট সিলেটের কোর্ট পয়েন্ট, জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, আম্বরখানা, আখালিয়া, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ফটক ছাড়াও উপজেলা পর্যায়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। জেলার গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোয়াইনঘাটসহ সব ক’টি উপজেলা হাজার হাজার ছাত্র-জনতার মিছিলে মুখর হয়ে ওঠে। ৪ আগস্ট সিলেটের গোলাপগঞ্জে মসজিদে মসজিদে মাইকে ঘোষণা দিয়ে রাজপথে নামে জনতা। মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে বিজিবি-পুলিশ। ঘটনাস্থলেই শহীদ হন নাজমুল ইসলাম, তাজউদ্দিন, গৌছ উদ্দিন, মিনহাজ আহমদ ও সানি আহমদ। গুরুতর আহত অবস্থায় জয় আহমদকে সিলেটের ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তিনি মারা যান।

৫ আগস্ট সিলেট নগরে আন্দোলনে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন কামরুল ইসলাম পাবেল, কোতোয়ালি থানা কম্পাউন্ডে নিহত হন পঙ্কজ দাস। ওই সময় টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলিবর্ষণে শতাধিক মানুষ আহত হন। রক্তাক্ত হয়ে ওঠে উপজেলার বিয়ানীবাজার পৌর শহর- নিহত হন তারেক আহমদ, ময়নুল ইসলাম ও সুহেল আহমদ।

একই দিন (৫ আগস্ট) কোতোয়ালি থানা কম্পাউন্ডে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অটোরিকশাচালক গোলাপগঞ্জের বাসিন্দা পঙ্কজ কুমার কর। এছাড়া একই দিনে দক্ষিণ সুরমা থানা কম্পাউন্ডে নিখোঁজ হন অটোরিকশাচালক শাহজাহান। তার খোঁজ মিলেনি আজও।

এছাড়া গোয়াইনঘাট সদরের ফেনাই কোনা গ্রামের তরুণ ব্যবসায়ী সুমন মিয়া, পশ্চিম জাফলংয়ের ইসলামাবাদ গ্রামের শ্রমিক নাহেদুল, পান্থুমাই গ্রামের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র সিয়াম আহমদ রাহিম নিহত হন। তারা তিনজন এবং নগরীর ঝালোপাড়ার নিখিল চন্দ্র করের ছেলে অটোরিকশাচালক পংকজ কুমার কর। লালাবাজারে আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের গাড়ি চাপায় প্রাণ হারান স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা। তাদের ভাগ্যে জোটেনি শহীদের স্বীকৃতি কিংবা কোনো ধরনের সহায়তাও পায়নি তাদের পরিবার। এমনকি তাদের বিচার পাওয়া নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।

জানা গেছে, দক্ষিণ সুরমা থানায় নিখোঁজ অটোরিকশাচালক শাহজাহানের স্ত্রীও সন্তানকে রেখে অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন প্রথম অবস্থায় তার খোঁজে আন্দোলনে স্বোচ্ছার হলেও পরে রহস্যজনক কারণে নিভৃত হয়ে পড়েন। শাহজাহানের ভাগ্যে কী ঘটেছে, আজও সেটি রহস্যঘেরা রয়ে গেছে। তাকে হত্যা করে থানা কম্পাউন্ডে গুম করা হতে পারে বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু স্বজনহারাদের কান্না থামেনি আজও।

Manual3 Ad Code

শহীদ পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার দুই বছর পার হলেও হত্যাকাণ্ডের বিচারের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখছেন না তারা।

শহীদ মিনহাজ আহমদের মা সিতাই বেগম বলেন, “গণঅভ্যুত্থানে আহত মানুষকে উদ্ধার করতে গিয়ে তার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছেন। তিনি ছেলে হত্যার বিচার দেখে মরতে চান।”

স্ত্রী এবং দুই কন্যাসন্তান ইশা জান্নাত তানহা ও খাদিজা জান্নাতকে রেখে গেছেন শহীদ তাজউদ্দিন। এখনো তারা বাবার জন্য পথ চেয়ে থাকে। স্বামী হারা তার স্ত্রী দুই সন্তানকে আঁকড়ে ধরে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।

দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে সানি ছিলেন সবার বড় শহীদ সানি আহমদের মা রাবিরা বেগম বলেন, ছাত্র-জনতার মিছিলে গিয়ে গুলিতে শহীদ হয়েছেন তার ছেলে। সন্তানের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে চান তিনি।

Manual3 Ad Code

শহীদ নাজমুল ইসলামের মা চায়না বেগম বলেন, আমার ছেলে আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে মারা যায়। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই।

এখনও ছেলেকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি শহীদ কামরুল ইসলাম পাবেলের বাবা রফিক উদ্দিন ও মা দিলারা বেগম। দুই বছর পার হলেও হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান তারা।

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code