Main Menu

তথ্য প্রযুক্তিতে পথিকৃৎ মিরাজুন্নবী সা.

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : মিরাজকালে রাসূল (সা.)কে অগণিত বিষয় দেখানো হয়েছিল, নবী-রাসূলদের সঙ্গেব সাক্ষাৎ ও কথোপকথন, জামাতে নামাজ আদায়, বেহেশ-দোজখ, ভাগ্যলিপি, আবে কাওসারসহ পরকালীন অপূর্ব বিষয়াদি দেখিয়ে ভোরের আগেই দুনিয়ায় ফিরিয়ে আনা হয়। এ সব ঘটনা ঘটতে বিপুল সময়ের প্রয়োজন। তা ছাড়া আল্লাহর কুদরতে মেরাজের রাতের ওই সময়ে পৃথিবীর সব চলমানতা, গতিশক্তি, কাজকর্ম, ঘড়ির কাঁটা স্তব্দ করে রাখা হয়েছিল বলেই অতি সীমিত সময়ে ঐশ্বর্গিক সব জিনিস দেখিয়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল।

সৃষ্টিতে এমন কিছু রহস্যপূর্ণ ও বিস্ময়কর ঘটনা আছে যার ভেদ একমাত্র স্রষ্টা ছাড়া কেউ জানেন না। বিজ্ঞানময় কোরআনে অসংখ্য অলৌকিক ও বিস্ময়কর ঘটনার উল্লেখ থাকলেও এর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম বিস্ময়ের বিস্ময় হল মিরাজ।

যে ঐশী মানবকে কেন্দ্র করে সৌন্দর্যময় গুলবাগিচা ধরিত্রী সৃষ্টি, আল্লাহতায়ালার সেই পেয়ারে হাবিবকে আল্লাহ সৃষ্টির অসীম রহস্য ভান্ডারের কিয়দাংশ দেখালেন। আশেক-মাশুকের মিলন ছাড়া আসল প্রেম কি পূর্ণতা পায়! মিরাজ, যার শাব্দিক অর্থ ঊর্ধ্বগমন, ভ্রমণ, ইশরা। আল্লাহ, তাঁর প্রেমের খেলা দেখাতে বানিয়েছেন মানুষ। তার প্রিয় হাবিবকে তাঁর আঙ্গিনায় আলিঙ্গনে কৃতার্থ করাতে সৃষ্টির সেরা প্রেমের মাধুর্য প্রকাশ পেল। যখন রাসূলে পাকের জীবনসঙ্গিনী খাদিজা বিবির ওফাত হল, ইসলামের শত্রæরা তাঁকে নিঃশেষ করে দিতে সব ষড়যন্ত্র পাকাপোক্ত করে ফেলেছে, মাশুকের এমন অবস্থা আশেক কীভাবে সহ্য করেন! তাই তো তিনি আমন্ত্রণ জানালেন। জিবরাইলকে (আ.) পাঠালেন তাঁর আসল রূপে (দিগন্ত বিস্তৃত) ‘বোরাকে’ তাঁকে নিয়ে যেতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আক্সা হয়ে ঊর্ধ্ব জগতে। লওহে মাহফুজে তার দরবারে এলাহিতে, সশরীরে দিদার করার সুযোগ দিয়ে তাঁর ভগ্ন হৃদয়কে সান্ত¡না দিতে। আর মহান সৃষ্টির কিছু অলৌকিক নিদর্শন দেখাতে। যেমনভাবে মানুষ তার গোপন ঐশ্বর্যভান্ডার দেখান তার প্রিয়জনকে।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মিরাজ : প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে রকেট তো দূরের কথা, বিমান কিংবা চার চাকার গাড়িও ছিল কল্পনাতীত। সে যুগেই পবিত্র কোরআন প্রমাণ করেছে মহাকাশ ভ্রমণ এবং বিজয় সম্ভব।

‘ইয়া মাশারাল জিন্নি ওয়াল ইনসি ৃ ইল্লা বি-সুলতান’ (সূরা আর রহমান ৩৩)। ‘হে জিন ও মানব স¤প্রদায়! আকাশমন্ডল ও ভূমন্ডলের সীমা তোমরা যদি অতিক্রম করতে পার তাহলে অতিক্রম কর; কিন্তু তোমরা অতিক্রম করতে পারবে না। মহাক্ষমতা ব্যতিরেকে। এ আয়াতে জানা যায় ‘তোমরা যদি পার মহাকাশে প্রবেশ কর’ এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্রহ্মান্ডর বিশালতা ভেদ করে অপর প্রান্তে যাওয়ার ক্ষমতা মানবের সীমিত জ্ঞান ও প্রযুক্তি দিয়ে সম্ভব নয়। কেননা অপর প্রান্ত/পিঠ বলতে কোনো প্রান্ত নেই, অনন্তকাল চললেও মহাশূন্যের বিশালতা শেষ হবে না। তবে প্রবেশ করার অনুমতি স্পষ্ট। এ থেকে ধরে নেয়া যায় মহাকাশ গবেষণায় নিয়োজিত ‘নাসা’র প্রচেষ্টা সফলকাম হবে এবং হচ্ছে।

জ্যোতির্বিজ্ঞান : আকাশে ছড়িয়ে থাকা ঘন তারকারাজির দীর্ঘ সারি রেখা মিলকিওয়ে বা ছায়াপথের বিস্ময় নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের গবেষণার যে যাত্রা প্রাচীন যুগে শুরু হয়েছিল কালের পরিক্রমায় মাউন্ট উইলসনের মতো সর্বাধুনিক টেলিস্কোপ আবিষ্কারে তা আরও সমৃদ্ধি লাভ করেছে। ধরা পড়েছে বহু নতুনত্ব। ছায়াপথের বিশালতা এবং ক্রমবর্ধমান সংখ্যা। যার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে আলো যেতে সময় লাগে লাখ লাখ আলোকবর্ষ। আমাদের চোখে দেখা ছায়াপথের মতো লাখোকোটি ছায়াপথ নিয়ে মহাব্রহ্মান্ড সৃষ্টি। যার ধারণা পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে বর্ণিত আছে। ‘তিনি সর্ব নিুাকাশকে তারকারাজি দিয়ে সুশোভিত করেছেন’- ৩৭(৬)। মহান স্রষ্টা বিজ্ঞানময় কোরআনে ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি ও স¤প্রসারণ করার ক্ষমতা সম্পর্কে চিন্তা, গবেষণা এবং আবিষ্কারের জন্য জ্ঞানীদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

আরও বহু আয়াতে মহাকাশ, নক্ষত্রাদির সৃষ্টি, বিচিত্র অবস্থান নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন এবং জ্ঞানীদের আরও জ্ঞান অন্বেষণ ও গবেষণার আহবান জানিয়েছেন। উজ্জ্বল-অতিউজ্জ্বল গ্রহ-নক্ষত্রের সমাহারে বিশ্বব্রহ্মান্ডের মহাপ্রকৃতি যেন (ব্লাকহোল ব্যতীত) চিরউজ্জ্বল-জ্যোর্তিময় আভায় আবৃত। মেরাজে নবীজীর মহাকাশ ভ্রমণের অলৌকিক পথ ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞান সর্বাধুনিকতার সোপানে পৌঁছার পথ পেয়েছে।

রকেট আবিষ্কার : মিরাজে ব্যবহৃত দ্রুতগামী বাহন ‘বোরাকের’ ধারণা থেকে আধুনিক যুগের গবেষণায় রকেট সৃষ্টি। মানবসৃষ্ট রকেট যদি চাঁদ, মঙ্গল, নেপচুন, প্লুটো কিংবা বানার্ড নামক নক্ষত্রে পৌঁছতে পারে তাহলে কুদরতি বোরাক মহাকাশের ঊর্ধ্বতনস্থ (সপ্তাকাশমন্ডলী) ভেদ করতে এবং সিদরাতুল মুসতাকিম ও মুনতাহায় কেন অবস্থান নিতে পারবে না?

মহাকাশ স্টেশন : আধুনিক বিজ্ঞান, মহাশূন্যের (দুই গ্রহের) আকর্ষণ-বিকর্ষণবিহীন ‘ভেকুয়া’ বা ‘ইকোয়লিব্রিয়াম পয়েন্টে’ স্টেশন গড়ে রকেট মেরামত, জ্বালানি সববরাহ ও বিশ্রামাগার-নির্মাণ করে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। আর মিরাজে-বোরাক থামল, নবী (সা.) নেমে গেলেন। জিবরাইল (আ.) ও বোরাক আর যেতে পারল না। (এগুলো আল্লাহর জ্যোতিতে ভস্ম হয়ে যেত)।

‘বোরাকে আরোহণ করে মহাকাশ অতিক্রম করে গেলেন নবী (সা.)। মহান প্রভুর নৈকট্য লাভে দ্রুত চলে গেলেন সিদরাতুল মুনতাহায় আর জিবরাইল (আ.) পরে গেলেন পেছনে। মানুষ হয়ে গেল ফেরেশতাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।’

চলমান কোনো যান, বিমান বা রকেট থামতে হলে স্টেশনের দরকার হয়। আর মহাকাশের সর্বোচ্চ সীমায়- শেষ স্টেশনে অবতরণ করেন নবী করিম (সা.)। সেখান থেকে তাঁকে বহন করল ‘রফ রফ’ নামক স্বয়ংক্রিয় চেয়ারে বসার মতো, লিফট সাদৃশ্য যান। যা তাঁকে নিমিষে পৌঁছে দিলেন আরশে আজিমে। তিনি কেমন স্টেশনে অবতরণ করে বাহন পরিবর্তন করেছিলেন, তেমন ভাবনা/ধারণা থেকেই আধুনিক বিজ্ঞানের চিন্তায় এল মহাশূন্যে স্টেশন গড়ার। তাতে সফলও হলেন তারা।

গতি বিজ্ঞান : আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত সব ধরনের বাহনের মধ্যে রকেট সর্বাপেক্ষা দ্রæতগামী। মহাকর্ষ ভেদ করার শক্তি এতে প্রয়োগ করা হয় বলেই তা মহাকর্ষ ভেদ করে ওপরে উঠতে পারে। মিরাজে ব্যবহৃত বোরাক ছয়শ’ পাখাবিশিষ্ট, এর গতি সেকেন্ডে কত আলোকবর্ষ ছিল তা আধুনিক বৈজ্ঞানিকদের কাছেও অধরা {পারসেক (প্রতি সেকেন্ডে) পদ্ধতি দিয়েও তা নির্ধারণ সম্ভব নয়}। দ্রুতগামী রকেট আবিষ্কারের ধারণা দ্রুতগামী বাহন বোরাক থেকে পাওয়া যায়। জীবের বাঁচার জন্য খাদ্য প্রয়োজন, যানবাহন চলার জন্য প্রয়োজন ফুয়েলের, রকেটের জন্য প্রয়োজন নিউক্লিয়ার এটোমিক এনার্জি আর বিশ্ব প্রকৃতিতে বিরাজমান লাখো কোটি তারকাপুঞ্জের জন্য প্রতি সেকেন্ডে বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন টন গ্যাসীয় পদার্থ-হাইড্রোজেন এটম থেকে হিলিয়াম এটোম জ্বালানি হিসেবে প্রয়োজন। যে মহান স্রষ্টা বিশ্বব্রহ্মান্ডের তারকারাজি প্রাকৃতিক জ্বালানি দিয়ে জ্বালিয়ে গতিশীল রেখেছেন, সুবিন্যস্ত করে পরিচালনা করছেন, সৃষ্টি ও ধ্বংসের একমাত্র মালিক তিনি। সেই মহান প্রভুর দিদার/সান্নিধ্য লাভই মিরাজের মূল উদ্দেশ্য। বিশ্বপ্রকৃতির সেই স্রষ্টাকে মানাই মানুষের শ্রেষ্ঠ ধর্ম।

বাসযোগ্য বহু গ্রহের অস্তিত্ব : মিরাজে রাসুল (সা.)কে বেহেশ্ত ও দোজখ দেখানো হয়। বেহেশতি আবাসে সুশীতল বায়ু, পত্রপল্লবে সুশোভিত মল্লিকা, মুক্ত বাতায়ন, পাদদেশে প্রবাহমান স্রোতস্বিনী, মুক্তার মতো ঝকমকে ঝরনা ধারা দিয়ে তৈরি অপরূপ পরিবেশ এবং আবে কাওসার দেখানো হয়েছিল। পবিত্র কোরআনে অসংখ্যবার বিশ্বগুলোর বহু বচন ব্যবহার করে বহু বিশ্বের ইঙ্গিত করা হয়েছে। মানুষ ছাড়াও জিন এবং ফেরেশতাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে খোদ কোরআনে বর্ণিত। আমরা তাদের দেখি না বটে। মানুষ ছাড়া বাকিদের আবাসই বা কোথায়! আল্লাহর সৃষ্ট মহাব্রহ্মান্ডের কোথাও না কোথাও এমন বিশ্ব (বেহেশত সাদৃশ্য) গ্রহ/পৃথিবী সৃষ্টি করে রেখেছেন। বর্ণিত তথ্যে বোঝা যায় পৃথিবীর মতো বা তার চেয়েও বেশি সুন্দর বাসযোগ্য গ্রহের অস্তিত্ব রয়েছে। শুধু খুঁজে বের করাই বিজ্ঞানের কাজ।

মিরাজকালে রাসূল (সা.)কে অগণিত বিষয় দেখানো হয়েছিল, নবী-রাসূলদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কথোপকথন, জামাতে নামাজ আদায়, বেহেশ-দোজখ, ভাগ্যলিপি, আবে কাওসারসহ পরকালীন অপূর্ব বিষয়াদি দেখিয়ে ভোরের আগেই দুনিয়ায় ফিরিয়ে আনা হয়। এসব ঘটনা ঘটতে বিপুল সময়ের প্রয়োজন। তা ছাড়া আল্লাহর কুদরতে মেরাজের রাতের ওই সময়ে পৃথিবীর সব চলমানতা, গতিশক্তি, কাজকর্ম, ঘড়ির কাঁটা স্তব্দ করে রাখা হয়েছিল বলেই অতি সীমিত সময়ে ঐশ্বর্গিক সব জিনিস দেখিয়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহের কিংবা পৃথিবীর সময় থেকে ভিন্ন গ্রহের সময়ের ব্যবধানই এর কারণ। এ থেকে বোঝা যায় যে, সময়ের আপেক্ষিকতা অবস্থান ভেদে ভিন্ন। এর সঙ্গে আলবার্ট আইনস্টাইনের জবষধঃরারঃু ড়ভ ঃরসব ঞযবড়ৎু’র সাদৃশ্যতা টানা যেতে পারে!

বিদ্যমান সব ধর্মের মধ্যে ইসলাম শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। তা কী শুধু সর্বশেষ ঐশী ধর্ম বলেই? না জ্ঞান-বিজ্ঞান, যুক্তি ও প্রযুক্তির ইস্পাত কঠিন পরীক্ষায় ও পর্যবেক্ষণের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে। পবিত্র কোরাআনে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো যত বেশি ও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে অন্য কোনো ঐশী গ্রন্থে তার সিকিভাগও হয়নি। তাই কোরআনকে বলা চলে বিজ্ঞানের পথনির্দেশিকা বা ‘মাদার অব দি সাইনস্’। কোরআনিক ধর্ম ইসলাম আর বিজ্ঞান তথা জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূত্র ও তথ্যাবলি এবং আধুনিক বিজ্ঞানী, শিক্ষিত পন্ডিতদের মধ্যে বৈপরীত্য নেই- রয়েছে সখ্য/সাদৃশ্য।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানব জাতির হেদায়েতের জন্য যুগে-যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। নবী রাসুলদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মুজিজা। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কেও অসংখ্য মুজিজা দান করা হয়েছিল। এর মধ্যে শ্রেষ্ঠ মুজিজা হলো মিরাজ। পৃথিবীর ইতিহাসে আশ্চর্যজনক ঘটনাগুলোর মধ্যে মিরাজের স্থান সবার ঊর্ধ্বে। মিরাজ আরবি শব্দ; যার অর্থ সিঁড়ি, ঊর্ধ্বগমনের যন্ত্র , আরোহণের বস্তু ইত্যাদি।

ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায়, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আহবানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বর্গীয় বাহন বোরাকে আরোহণ করে বায়তুল্লাহ থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস এবং সেখান থেকে আরশে আজিমে আল্লাহর দরবারে হাজির হয়ে তাঁর প্রত্যক্ষ দিদার লাভ করার উদ্দেশ্যে যে ভ্রমণ করেছিলেন তাকে মিরাজ বলে আখ্যায়িত করা হয়।

পবিত্র কোরআনে মিরাজের ঘটনাকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে—পবিত্র ও মহিমান্বিত তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে (রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে) এক রজনীতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় পরিভ্রমণ করিয়েছেন। যার চারপাশ আমি (আল্লাহ) বরকতময় করেছিলাম তাকে আমার নিদর্শনগুলো পরিদর্শন করানোর জন্য, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” -(সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ১)

ওই আয়াতে ইসরা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ রাত্রিকালীন ভ্রমণ। মিরাজ রাত্রিবেলা সংঘটিত হয়েছিল তা এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত।

নবুয়তের দশম বছরে হিজরতের প্রায় ১৮ মাস আগে রজব মাসের ২৬ তারিখ রাতে মিরাজ সংঘটিত হয়। কোনো কোনো সহিহ হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী ঘটনাটি ঘটেছিল অন্য তারিখে।

মিরাজ দুটি পর্যায়ে বিভক্ত। প্রথম পর্যায়ে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ, যাকে ‘ইসরা’ বলা হয়, যা পবিত্র কোরআন দ্বারা সাব্যস্ত। দ্বিতীয় পর্যায় হলো, মসজিদুল আকসা থেকে ঊর্ধ্বলোকে ভ্রমণ, যাকে মিরাজ বলা হয় এবং তা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।

মিরাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনাটি হলো : মিরাজের রাতে রাসুল (সা.) উম্মেহানির ঘরে শুয়ে ছিলেন, হজরত জিব্রাঈল (আ.) এসে তাকে জাগালেন এবং কাবাঘর প্রাঙ্গণে নিয়ে বক্ষ বিদীর্ণ করা হয়। তারপর বোরাক নামক স্বর্গীয় বাহনের মাধ্যমে বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছেন। সেখানে কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। যেখানে পূর্ববর্তী সব নবী-রাসুলগণ অপেক্ষা করছিলেন। তিনি ইমাম হয়ে সবার সঙ্গে নামাজ আদায় করলেন। কেউ কেউ বলেন, এ নামাজ আকাশ থেকে ফেরার পরে হয়েছিল।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আমার সামনে এক পেয়ালা শরাব এবং এক পেয়ালা দুধ রেখে যেটি ইচ্ছা পান করতে বলা হলো, আমি দুধের পেয়ালা পান করলাম। তা দেখে হজরত জিব্রাঈল (আ.) বললেন, এটিই দ্বীন (ধর্ম); যার উপর আপনি এবং আপনার উম্মত কায়েম থাকবেন।”
তারপর আকাশের দিকে রওয়ানা হন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “অতঃপর আমাকে নিয়ে নিকটতম আকাশের দিকে উঠলেন।” প্রথম আসমানে পৌঁছতেই আকাশের দ্বার রক্ষীরা দরজা খুলে দিল। অতঃপর তিনি হজরত আদম (আ.) এর সঙ্গে সাক্ষাত করেন। তারপর পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় আসমানে হজরত ঈসা (আ.), তৃতীয় আসমানে হজরত ইউসুফ (আ.), চতুর্থ আসমানে হজরত ইদরিস (আ.), পঞ্চম আসমানে হজরত হারুন (আ.), ষষ্ঠ আসমানে হজরত মুসা (আ.) ও সপ্তম আসমানে হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর সঙ্গে সাক্ষাত করেন, তখন তিনি বায়তুল মামুরে হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। হজরত জিব্রাঈল (আ.) একে-একে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

সপ্তম আসমানের শেষ প্রান্তে তিনি চমৎকার একটি নহর দেখলেন, যার চতুর্দিকে মনোরম দৃশ্য। ইয়াকুত, মতি ও জহরতের অসংখ্য পেয়ালা এবং উপবিষ্ট সবুজ বর্ণের অসংখ্য পাখি। সে নহর দিয়ে দুধের মতো পানি বয়ে যাচ্ছিল। হজরত জিব্রাঈল (আ.) বলেন, আল্লাহপাক আপনাকে কাউসারের যে সুসংবাদ দিয়েছেন,“আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি।” -(সূরা কাউসার, আয়াত : ১)

এটি হচ্ছে সেই কাউসার। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আমি এক পেয়ালা করে পানি পান করলাম, আমার মনে হলো তা মধুর চেয়েও মিষ্টি ও সুস্বাদু এবং মেশকের চেয়ে অধিক সুগন্ধযুক্ত।” তারপর জিব্রাঈল (আ.)-কে নিয়ে জান্নাত, জাহান্নাম দেখলেন। এভাবে উপরে আরোহণ করে সিদরাতুল মুনতাহা বা সীমান্তের কুল বৃক্ষের কাছে পৌঁছেন। যার ফল আকারে বড়-বড় মটকার মতো, পাতাগুলো হাতির কানের মতো। হজরত আবু যার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আমি সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছে আশ্চর্যজনক নূরের তাজাল্লি ও বিস্ময়কর কুদরত অবলোকন করলাম। তখন আমি উপলব্ধি করতে পারিনি এসব কি ছিল। পরে আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো। জান্নাতের গম্বুজগুলো মণিমুক্তায় খচিত এবং মেশক আম্বরের।” -(বুখারি ও মুসলিম)

সেখান থেকে জিব্রাঈল (আ.) বিদায় নেন এবং রফরফ নামক আরেক কুদরতী বাহনে আরোহণ করে নূরের রাজ্যে প্রবেশ করেন। একে একে সত্তর হাজার নূরের পর্দা অতিক্রম করেন, যার প্রত্যেকটি ছিল খুবই সুন্দর, স্বকীয় বৈশিষ্ট্যমন্ডিত এবং ভিন্ন ভিন্ন রকমের। এভাবে তিনি আরশে আজীমে পৌঁছেন।

আল্লাহপাকের সঙ্গে তাঁর প্রিয় হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একান্তভাবে সাক্ষাত করেন। তখন অনেক গোপন কথা হয়, যা আল্লাহ ও তাঁর হাবিবই ভালো জানেন। আল্লাহপাক মানব জীবনে ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ সাধনের জন্য যা প্রত্যাদেশ করার প্রয়োজন ছিল, তা প্রত্যাদেশ করলেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “অতঃপর সে (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর নিকটবর্তী হলেন, অতি নিকটবর্তী। ফলে তাঁদের মধ্যে দুই ধনুক পরিমাণ অথবা তার চেয়েও অল্প দূরত্ব বাকি রইল, তখন আল্লাহপাক তাঁর বান্দার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করার প্রয়োজন ছিল, তা করলেন। -(সূরা নাজম, আয়াত ৮-১০)।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রত্যক্ষ দিদার লাভ করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হাদিয়া নিয়ে দুনিয়ার বুকে ফিরে আসেন।

এসব ঘটনা অতি অল্প সময়ে সংঘটিত হয়েছিল। মক্কায় এসে দেখেন তাঁর ব্যবহৃত ওজুর পানি গড়াচ্ছে এবং দরজার শিকলটাও নড়ছে।
সব ঘটনা যখন তিনি সাহাবায়ে কিরামদের সামনে বর্ণনা করলেন, তখন সাহাবায়ে কিরাম আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “আমরাও যদি মিরাজে গমন করতে পারতাম!” এ সময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেন, নামাজ মুমিনদের জন্য মিরাজস্বরূপ। -(ইবনে মাজাহ)
অপরদিকে মিরাজের বর্ণনা শুনে মক্কার কাফিররা মিথ্যা বানোয়াট বলে উপহাস করতে লাগল। এমনকি মুসলমানদের মধ্যেও অনেকে দ্বিধাদ্ব›েদ্ব পড়ে গেল। হযরত আবু বকর বিনাবাক্যে বিশ্বাস করলেন। ফলে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সিদ্দিক বা সত্যবাদী উপাধি দান করেন। কাফিররা বিশেষ করে আবু জেহেল রাসুলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাছে বায়তুল মুকাদ্দাসের যথাযথ বর্ণনা জানতে চাইলে আল্লাহপাক জিব্রাঈল (আ.)-কে নির্দেশ করেন বায়তুল মোকাদ্দাসসহ রাসুলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে হাজির হওয়ার জন্য। রাসুল (সা.) তা দেখে দেখে সবার সামনে এর সম্পূর্ণ বর্ণনা দেন। বর্তমানে যেমন টিভির পর্দার মাধ্যমে হাজার হাজার মাইল দূরের ছবি দেখা যায় তেমনি হয়তোবা জিবরাইল (আ.) বায়তুল মোকাদ্দাসের প্রতিচ্ছবি রাসুলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে উপস্থাপন করেন। যা দেখে তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেন।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে বিশেষ করে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত¡ প্রকাশিত হওয়ার পর মিরাজের সত্যতা সম্পর্কে বিশ্বাস করা আরও সহজ হয়েছে। গতি বিজ্ঞানের একটি থিউরি হলো, “পৃথিবী থেকে কোনো ভারি বস্তুকে যদি প্রতি সেকেন্ডে ৬.৯০ অর্থাৎ সাত মাইল বেগে ঊর্ধ্বলোকে ছুড়ে মারা যায়, তবে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে তা আর পৃথিবীর দিকে ফিরে আসে না।” নভোচারীদের রকেট যানে চাঁদে গমন এর বাস্তব প্রমাণ। আগেই বলা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাহন ছিল বোরাক, যা برك বারক শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ বিদ্যুৎচালিত যান। তাহলে অবশ্যই এর গতি প্রতি সেকেন্ডে সাত মাইলের চেয়ে বেশি ছিল। তাই মিরাজ তথা উর্ধ্বলোকে ভ্রমণ সম্ভব নয়, রিরুদ্ধবাদীদের এ ধারণা অবান্তর।

বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার স্পুনিক, অ্যাপোলোর মতো অতি দ্রুত গতিসম্পন্ন মহাকাশ যান চাঁদ ও অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহে প্রেরিত হচ্ছে। নাসার বিজ্ঞানীরা মহাকাশ গমনের জন্য লিফট আবিষ্কার করার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা যদি এমন একটি যান তৈরি করতে পারেন যা চোখের পলকেই মহাকাশে যাবে, তাহলে সেই বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী, সৃষ্টিকর্তা ও মালিক, যিনি রাব্বুল আলামিন তিনি কি তাঁর বন্ধুকে মুহূর্তের মধ্যে মহাকাশে নিয়ে যেতে পারেন না(?)

শেষ কথা হচ্ছে, মিরাজ একটি মুজিজা। আর মুজিজা তাকেই বলা হয়, যা মানুষের জ্ঞানকে অক্ষম করে দেয়। মানুষ তার সীমিত জ্ঞান ও যুক্তি দ্বারা মিরাজ উপলব্ধি নাও করতে পারে, তাই বলে মিরাজের বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন করা যাবে না। যদি মিরাজের বিরুদ্ধাচরণ করা হয়, অবশ্যই তা ঈমানের পরিপন্থী। মিরাজ সত্য ও বাস্তব এবং দৈহিকভাবে সংঘটিত হয়েছিল, যা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের অকাট্য প্রমাণ। বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত, নবীকুল শিরোমণি জীবনের শ্রেষ্ঠ ও ঐতিহাসিক ঘটনার স্মারক এ রজনীটি প্রায় চৌদ্দ শত বছর ধরে বিশ্বের প্রতিটি মুসলিম দেশে যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে।

মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আল্লাহুম্মা আমিন!!!

লেখক- গবেষক ও কলামিস্ট, পাঠান পাড়া (খান বাড়ী) কদমতলী, সিলেট-৩১১১।

 

 

 

 

 

Share





Comments are Closed