Main Menu

তীব্র শীত বা গরম মুমিনদের ইমানের পরীক্ষা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: মানুষের পার্থিব জীবনে অসংখ্য নিদর্শনের মাঝে একটি হলো- ঋতুচক্র। গ্রীষ্মের বিপরীত শীতের ঋতু, তেমনি শীতের বিপরীত গ্রীষ্মকাল। বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ হলেও পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশ চার ঋতুর। ঋতুরভেদে শীতের তীব্রতায় যখন এশিয়া, আমেরিকা বা ইউরোপের মানুষের জীবন বিপর্যস্ত; তখন পৃথিবীর আরেক প্রান্তের দেশ অস্ট্রেলিয়ায় চলছে তীব্র গরম।
ঊষার আলোয় ভরা প্রভাতের পরিবেশ বিকেলের গোধূলিতে বদলে যায়, এটাই পৃথিবীর রীতি।

কিছুদিন আগেও যে শিশুটির কোনো অস্তিত্ব ছিলো না, সে আজ জীবন্ত এবং পূর্ণ অস্তিত্বময় মানুষ আপনার-আমার জীবনে। এটাই জীবনচক্র। আবার আজ যে মানুষটি ঘিরে আছে আপনার বাস্তবতায়, সে হয়তো আগামীকাল অস্তিত্বহীন এই ধরায়। আপনি আমি সবাইকে চলে যেতে হবে, সঙ্গী হবে শুধু কর্মটুকু।

এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে আল্লাহতায়ালা বলেন, তুমি রাতকে দিনের মধ্যে প্রবেশ করাও এবং দিনকে রাতের মধ্যে। জীবনহীন থেকে জীবন্তের আবির্ভাব ঘটাও এবং জীবন্ত থেকে জীবনহীনের। আর যাকে চাও তাকে তুমি বেহিসেব রিযিক দান করো।

অনেকের কাছে শীতকাল প্রিয় ঋতু। শীতকালে পৃথিবীতে আল্লাহর বিশেষ রহমত বর্ষিত হয়। শীতকালে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অপার কৃপায় জমিনে জন্মে প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি। স্বল্পমূল্যে পাওয়া যায় টাটকা শাকসবজি। শীতকালীন শাকসবজির মধ্যে রয়েছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, ব্রোকলি, গাজর, শালগম, টমেটো, শিম, চীনা বাঁধাকপি, লাল বাঁধাকপি, ফ্রেঞ্চবিনসহ আরো নানা সবজি! এর সঙ্গে রয়েছে লালশাক, পালংশাক, ঢেঁকিশাক, মুলাশাক ইত্যাদি। আর এ সব কিছুই আল্লাহ তাআলার অশেষ দান। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন,মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ করুক। এসব তোমাদের ও তোমাদের পালিত পশুকুলের জীবনধারণের জন্য।’

কালের আবর্তনকে একজন মুমিন গ্রহণ করে উত্তম আমল করার সুযোগ হিসেবে। উদাহরণ হিসেবে আমরা বলতে পারি, শীতকালের দীর্ঘরাতে একজন মুমিন যেমন পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমিয়ে আবার তাহাজ্জুদের নামাজ আদায়, কোরআন তেলাওয়াত ও জিকির- আজকার করা সময় পায়, তেমনি শীতল আবহাওয়ার ছোট দিনে নফল রোজা পালনও তার জন্যে হয়ে উঠে সহজ। শীতকালীন যুহরের নামায সম্পর্কে নবিজী এরশাদ করেছেন,আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (যুহরের সলাত) গরমকালে ঠান্ডা করে (গরম কমলে) আদায় করতেন আর শীতকালে আগে আগে আদায় করতেন।

প্রথম করণীয় হলো, মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। ঈমানদারের জন্য শীতকাল বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।

ঘূর্ণায়মান পৃথিবীর ঋতুচক্রের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার আমরা যে নিয়ম সম্পর্কে জানি, তা আল্লাহ তায়ালারই বানানো নিয়ম। আর শৈত্যপ্রবাহ, গ্রীষ্মের তাপদাহ, বসন্তের পুষ্পকানন কিংবা ঝড়ের তান্ডবসহ প্রকৃতির যে অবস্থার কথাই বলি না কেন- সবটাই আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আসে। হতে পারে তা মানুষের জন্য কল্যাণকর, নেকি অর্জনের পাথেয়, পরীক্ষা কিংবা ইহকাল ও পরকালের সঙ্কট। তীব্র শীত বা তীব্র গরম হতে পারে মুমিনের জন্য পরীক্ষা। হাদিস শরিফে এসেছে, শীতকাল মুমিনের জন্য ইবাদতের বসন্তকাল।

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যখন কোন মুসলিম অথবা মু’মিন বান্দা উযূ করে এবং তার চেহারা ধুয়ে নেয়, তখন তার চেহারা হতে পানির সাথে অথবা পানির শেষ বিন্দুর সাথে তার চোখের দ্বারা কৃত সকল গুনাহ বের হয়ে যায় যা সে চোখ দিয়ে দেখেছে। যখন সে তার দুই হাত ধোয় তখন তার দুই হাত দিয়ে করা গুনাহ পানির সাথে বা পানির শেষ বিন্দুর সাথে বের হয়ে যায় যা তার দু’হাত দিয়ে ধরার কারণে সংঘটিত হয়েছে। অনুরূপভাবে সে যখন তার দুই পা ধোয়, তার পা দ্বারা কৃত গুনাহ পানির সাথে অথবা পানির শেষ বিন্দুর সাথে বের হয়ে যায় যে পাপের জন্য তার দু’ পা হাঁটছে। ফলে সে (উযূর জায়গা হতে উঠার সময়) সকল গুনাহ হতে পাক-পবিত্র হয়ে যায়।

উসমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে মুসলিম র্ফায সলাতের সময় হলে উত্তমভাবে উযূ করে, বিনয় ও ভয় সহকারে রুক‚’ করে (সলাত আদায় করে তার এ সলাত), তা তার সলাতের পূর্বের গুনাহর কাফ্ফারাহ্ (প্রায়চিত্ত) হয়ে যায়, যতক্ষন না সে কাবীরাহ্ গুনাহ করে থাকে। আর এভাবে সর্বদাই চলতে থাকবে।

দ্বিতীয় করণীয় হলো, অজু ও গোসলের ব্যাপারে সচেতন হওয়া। শীতকালে মানুষের শরীর শুষ্ক থাকে। তাই যথাযথভাবে ধৌত না করলে অজু-গোসল ঠিকমতো আদায় হয় না। আর অজু-গোসল ঠিকমতো আদায় না হলে নামাজ শুদ্ধ হবে না। তাই এ বিষয়ে বিশেষভাবে যত্নবান হতে হবে;
উসমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি উযূ করে এবং উত্তমভাবে উযূ করে, তার শরীর হতে তার সকল গুনাহ বের হয়ে যায়, এমনকি তার নখের নিচ হতেও তা বের হয়ে যায়।

এমনকি শীতের মৌসুমে গরম পানি দিয়ে অজু করলেও সওয়াবে কমতি হবে না। অজুর গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, আমি কি তোমাদের এমন কিছু শিখিয়ে দেব না, যার কারণে আল্লাহ পাপ মোচন করবেন এবং জান্নাতে তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন? সাহাবারা বললেন, জি হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল! মহানবী (সা.) বললেন, ওই কাজগুলো হলো—মন না চাইলেও ভালোভাবে অজু করা, বেশি পদক্ষেপে মসজিদে যাওয়া এবং এক নামাজের পর অন্য নামাজের জন্য অপেক্ষা করা।’

ব্যাখ্যা: ‘‘যা দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা গুনাহসমূহ মুছে দিবেন।’’ অর্থাৎ- গুনাহ লিপিবদ্ধকারী লেখকদের দফতর থেকে গুনাহসমূহ মুছে ফেলবেন। আর এ মুছে ফেলাটাই আল্লাহ তাকে তা মাফ করে দিয়েছেন তার দলীল। এ গুনাহ দ্বারা ঐ সগীরাহ গুনাহ উদ্দেশ্য যা আল্লাহর হাক্বের সাথে সম্পৃক্ত।

‘‘আর তা দ্বারা পদমর্যাদা বাড়িয়ে দিবেন।’’ অর্থাৎ- জান্নাতে তাকে উঁচু মর্যাদা দান করবেন। অনুরূপভাবে দুনিয়াতেও তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

‘‘মাসজিদের দিকে অধিক পদক্ষেপ রাখা।’’ পায়ে হেঁটে চলার সময় দু’পায়ের মধ্যবর্তী জায়গাকে। যাকে আমরা বাংলা ভাষায় পদক্ষেপ বলি। অধিক পদক্ষেপ দু’টি কারণে হতে পারে। যথা- মাসজিদ থেকে বাসস্থানের অবস্থান দূরবর্তী স্থানে হওয়ার কারণে, বারবার মাসজিদে আগমনের কারণে। কারণ যাই থাক না কেন মাসজিদে অধিক যাতায়াতকারীর ব্যক্তির জন্য হাদীসে বর্ণিত মর্যাদা তার জন্য নির্ধারিত আছে।

‘এক সলাতের পর আরেক সলাতের জন্য অপেক্ষা করা।’’ অর্থাৎ- এক সলাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করার পর পরবর্তী সলাত আদায় করার উদ্দেশে মাসজিদে বসে থাকা অথবা সলাত আদায় করে স্বীয় কর্মস্থলে ফিরে যাবার পর পরবর্তী সলাত আদায়ের জন্য মনে মনে সংকল্প করা এবং এজন্য প্রস্ত্ততি গ্রহণ করা যাতে মাসজিদে গিয়ে পরবর্তী সলাত আদায়ে কোন ব্যাঘাত না ঘটে।

তৃতীয় করণীয় হলো, কারো যদি কাজা রোজা বাকি থাকে, তাহলে শীতকালে সেগুলো আদায় করে নেওয়া। তা ছাড়া বেশি বেশি নফল রোজা রাখারও এটি সুবর্ণ সময়। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘বিশুদ্ধ নিয়তে যে ব্যক্তি এক দিন রোজা রাখল, মহান আল্লাহ প্রতিদানস্বরূপ জাহান্নাম এবং ওই ব্যক্তির মাঝখানে ৭০ বছরের দূরত্ব তৈরি করে দেবেন।’

শীতকালে দিন থাকে খুবই ছোট। তাই শীতকালে রোজা রাখলে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকতে হয় না। নবিজী এরশাদ করেছেন,

আমির ইবনু মাসঊদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, শীতকালের রোযা হচ্ছে বিনা পরিশ্রমে যুদ্ধলব্ধ মালের অনুরূপ।

শীতের এই মওসুমে বেশি বেশি যেসব রোজা রাখতে পারেন- ক. আইয়ামে বিজ তথা হিজরি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোজা।

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ৩টি কাজের ওসিয়ত করেছেন-প্রত্যেক মাসে ৩টি রোজা রাখতে, চাশতের ২ রাকাত নামাজ পড়তে এবং ঘুমানোর পূর্বে বিতর নামাজ আদায় করে নিতে।’

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, ‘প্রণিধানযোগ্য মত হলো, এখানে ৩টি রোজা বলে আইয়ামে বিজের ৩ রোজাই বোঝানো হয়েছে।’ (ফাতহুল বারি)।

প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবারের রোজাঃ- এই ২ দিন রোজা রাখা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়মিত রুটিন ছিল। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘সোম ও বৃহস্পতিবারে রোজা রাখার ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই যত্নবান ছিলেন।’

আবু হুরায়রা (রা.) এর সূত্রে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘মানুষের আমলসমূহ প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবারে আল্লাহ তায়ালার নিকট পেশ করা হয়। আর আমি চাই, আমি রোজাদার অবস্থায় আমার আমলগুলো পেশ করা হোক।’

সাওমে দাউদ (আ.)ঃ সামর্থ্য ও সক্ষমতা থাকলে রোজা রাখার সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হলো সওমে দাউদ (আ.)। তিনি একদিন রোজা রাখতেন এবং একদিন রাখতেন না। এটাই ছিল তাঁর নফল রোজা রাখার নিয়ম। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সংবাদ প্রদান করা হলো যে আমি বলেছি, আল্লাহর শপথ! আমি (প্রত্যহ) দিনে রোজা রাখব এবং রাত্রে নফল নামাজে দাঁড়িয়ে থাকব। তিনি জিজ্ঞেস করলে আমি বললাম, জী আমি এমনটা বলেছি। তখন নবীজি আমাকে উপদেশ দিয়ে বললেন, তুমি তা পারবে না। (দিনে) রোজা রাখ এবং খাও, (রাত্রে) ঘুমাও এবং নামাজে দাঁড়াও, প্রতি মাসে ৩টি রোজা রাখ; কেননা এক নেকির বদলে দশগুণ সওয়াব আর এটা পুরো বৎসর রোজা পালনের সমান। আমি বললাম, নবীজি! আমি এরচেয়ে বেশি রোজা রাখতে সক্ষম। তিনি বললেন, তাহলে একদিন রোজা রাখবে এবং দুদিন খাবে। বললাম, আমি তারচেয়ে বেশি রাখতেও সক্ষম। বললেন, তবে একদিন রোজা রাখবে এবং একদিন খাবে। এটি নবী দাউদ (আ.) এর রোজা এবং এটি সর্বোত্তম রোজা। বললাম, আমি তারচেয়ে অধিক রাখতেও সক্ষম। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে দিলেন, এরচেয়ে উত্তম কোনো রোজা নেই।

চতুর্থ করণীয় হলো, তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করা। শীতকালে রাত অনেক লম্বা হয়। কেউ চাইলে পূর্ণরূপে ঘুমিয়ে আবার শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়তে সক্ষম হতে পারে। মহান আল্লাহ ঈমানদারদের গুণাবলি সম্পর্কে বলেন, “(গভীর রাতে) তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে। “কেউ জানে না তার কৃতকর্মের জন্য কি কি নয়ন-প্রীতিকর প্রতিদান লুক্কায়িত আছে।

আগের আয়াতে আল্লাহ তায়ালার সামনে সিজদাবনত হওয়ার কথা উল্লেখ করার পর এই দুই আয়াতে ঈমানদার ব্যক্তির আরো কিছু গুণ বা বৈশিষ্ট্যের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, তারা শুধু ফরজ নামাজগুলোই আদায় করে না সেইসঙ্গে গভীর রাতে যখন বাকি সবাই ঘুমে থাকে তখন জাগ্রত হয় এবং নামাজ ও মুনাজাতে মশগুল হয়ে যায়। আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হচ্ছে শেষরাত। কারণ তখন মানুষ দৈনন্দিন কাজকর্মের চাপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত অবস্থায় পরিপূর্ণ মনযোগ দিয়ে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হতে পারে। মানুষ যেন নিজের মন্দকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারে সেজন্য শেষরাত হচ্ছে সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এ সময়ে সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি জাহান্নামের আগুন থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তাঁর দরবারে অশ্রু ঝরাতে এবং তাঁর রহমতের অবগাহনে সিক্ত হওয়ার আশায় কান্নাকাটি করতে পারে।

নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহর সঙ্গে এই সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে সে তাঁর বান্দাদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায়ও অনুপ্রাণিত হয়। সে তার সামর্থ্য অনুযায়ী বিপদে পড়া মানুষদের সাহায্যে এগিয়ে যায় এবং তাকে আল্লাহ তায়ালা যে রিজিক দান করেছেন তা থেকে তাদেরকে দান করে।

পরের আয়াতে এ ধরনের মানুষদের জন্য আল্লাহর প্রতিদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো ধরনের প্রদর্শন ইচ্ছা ছাড়া যারা এভাবে প্রবল অনুরাগে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করে এবং তাঁর বান্দাদের খোঁজ খবর রাখে তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা এমন প্রতিদান দেবেন যা কেউ কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না, তিনি কি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার তাদের জন্য নির্ধারিত রেখেছেন।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: প্রকৃত মুমিন নিজেকে আল্লাহর আজাব থেকে যেমন মুক্ত ভাবে না তেমনি তাঁর রহমতের ব্যাপারেও নিরাশ হয় না। সে সব সময় ভয় ও আশা নিয়ে বেঁচে থাকে এবং কখনো অহংকার বা হতাশা তাকে পেয়ে বসে না।

মধ্যরাতের পর ঘুম থেকে জেগে উঠে কুরআন তেলাওয়াত করা, নামাজ পড়া এবং আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করা প্রকৃত মুমিনের লক্ষণ।এবং আল্লাহ তায়ালার অফুরন্ত পুরস্কার পেতে চাইলে ভোররাতে ঘুম থেকে জাগার কষ্ট সহ্য করতে হবে।

‘তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের রবকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।’
পঞ্চম করণীয় হলো, শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশে বছর ঘুরে আসে শীত-শৈত্যপ্রবাহ। পৌষ-মাঘ দুই মাস শীতকাল। হাড়-কাঁপানো শীতে নাকাল দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষ। শীতার্তসহ বিপন্ন সব মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের আদর্শ। মহান আল্লাহ বলেন,
‘তারা আল্লাহর প্রেমে উজ্জীবিত হয়ে দরিদ্র, এতিম ও বন্দিদের খাদ্য দান করে।’

চারপাশে দেখা যায়, লাখো মানুষ একটু উষ্ণতার জন্য জবুথবু হয়ে খড়কুটা জ্বালিয়ে একটু তাপ পেতে চায়। মানবিক ও ইসলামিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে ওই সব মানুষের পাশে সাধ্যমতো দাঁড়ানো উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, কোন মুসলিম তার কোন বিবস্ত্র মুসলিম ভাই কে কাপড় পরিধান করালে আল্লাহ তা’আলা তাকে জান্নাতে সবুজ পোশাক পরিধান করাবেন। কোন মুসলিম তার ক্ষুধার্থ মুসলিম ভাই-কে খাবার খাওয়ালে আল্লাহ তা’আলা তাকেও জান্নাতের ফল খাওয়াবেন। কোন মুসলিম তার কোন তৃষ্ণার্ত ভাই কে পানি পান করালে আল্লাহ্ তা’আলা তাকেও মোহরাঙ্কিত স্বর্গীয় সুধা পান করাবেন। আবূ দাউদ দুর্বল সানাদে।

তিরমিজি শরীফে বর্ণিত এক হাদিসে বলা হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দয়াশীলদের ওপর করুণাময় আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা দুনিয়াবাসীকে দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদের ওপর দয়া করবেন।

ষষ্ঠ করণীয় হলো, মোজার ওপর মাসেহ করা। এ ক্ষেত্রে নিয়ম হলো, অজু করে মোজা পরিধান করবে।

সফ্ওয়ান ইবনু ‘আস্সাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাথে সফর অবস্থায় কোথাও রওয়ানা হলে আমাদেরকে তিনদিন তিনরাত পর্যন্ত পবিত্রতার গোসল ছাড়া, এমনকি প্রসাব–পায়খানা ও ঘুমানোর পর মোজা না খুলে উযুর করার আদেশ করতেন।
মুকিম ব্যক্তির জন্য পরবর্তী এক দিন পর্যন্ত যতবার অজুর প্রয়োজন, তাতে পা ধোয়ার প্রয়োজন হবে না। বরং তিন আঙুল পরিমাণ মোজার ওপর মাসেহ করে নিলেই চলবে। মুসাফিরের জন্য এ সুযোগ তিন দিন পর্যন্ত। অসংখ্য হাদিস শরিফে রাসুল (সা.)-এর অনুরূপ আমলের কথা উল্লেখ পাওয়া যায়।

আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, দ্বীন যদি (মানুষের বুদ্ধি) অনুসারেই হত, তাহলে মোজার উপরের চেয়ে নীচের দিকে মাসাহ করাই উত্তম হত। আমি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে দেখেছি, তিনি মোজার উপরের দিকে মাসাহ করেছেন।

তবে এখানে একটি ভুল ধারণার নিরসন প্রয়োজন। অনেকেই মনে করেন, সব মোজার ওপরই মাসেহ করা যায়, যেমন—সুতি, নাইলনের মোজা ইত্যাদির ওপর মাসেহ বৈধ নয়। বরং মোজার ওপর মাসেহ করার জন্য মোজাটি এমন চামড়ার মোজা হতে হবে, যা টাখনু পর্যন্ত ঢেকে ফেলে অথবা চামড়ার মোজার গুণে গুণান্বিত—এমন মোজা হতে হবে। গুণগুলো ফিকাহবিদরা ফিকাহগ্রন্থগুলোতে উল্লেখ করেছেন, যা রাসুল (সা.)-এর হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকেই সংগৃহীত। ওই গুণগুলো হলো।

এক. মোজা এমন মোটা হতে হবে, যেন ওপরে পানি পড়লে ভেতরে না পৌঁছে।

দুই. সংকীর্ণতা বা রাবার অথবা সুতা ইত্যাদি দিয়ে বাঁধা ছাড়াও স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে পায়ের সঙ্গে লেগে থাকে। তিন. শুধু ওই মোজা পরিধান করেই দু-তিন মাইল চলা যায়।

তবে মনে রাখতে হবে যে মোজার ওপর মাসেহ করা জরুরি নয়; বরং এটি বৈধ ও অবকাশমূলক বিষয়। তবে সুন্নত হিসেবে এর ওপর আমল করা উত্তম!

লেখক- গবেষক ও কলামিস্ট, পাঠান পাড়া (খান বাড়ী) কদমতলী, সিলেট।

 

 

 

 

 

Share





Comments are Closed