সিলেট বা শ্রীহট্রের প্রথম সংবাদপত্র ও কিছু গৌরবময় ইতিহাস
মিলু কাশেম: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূরূপ লীলা নিকেতন মহান দরবেশ শাহ্ জালাল শাহ্পরাণসহ ৩৬০ আউলিয়া ও মহাপ্রভু শ্রী চৈতণ্যের পূণ্যভূমি সিলেটের রয়েছে হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি সিলেটের ইতিহাস ঐতিহ্য অনন্তকাল ধরে আকৃষ্ট করেছে মানুষকে। সিলেটের অনেক ইতিহাস গৌরবের কথা আছে যা বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানে না। যেমন আমরা অনেকেই জানি না সিলেট থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্রের কথা।
১৮৭৬ সালে সিলেট প্রকাশিত হয় প্রথম বাংলা সংবাদপত্র যার নাম ছিলো “শ্রীহট্র প্রকাশ”আর সম্পাদক ছিলেন প্যারীচরণ দাশ। এটা ছিলো তৎকালীন সুরমা বরাক উপত্যকার প্রথম এবং আসামের দ্বিতীয় বাংলা সংবাদপত্র। উল্লেখ বাংলা ভাষায় প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় ১৮১৮ সালের এপ্রিল মাসে। তার নাম ছিল “দিগদর্শন”এটি ছিল মাসিক পত্রিকা। সম্পাদক ছিলেন ইংরেজ ভদ্রলোক জে সি মার্শম্যান। এর একমাস পর পর” সমাচার দর্পণ” নামে এশটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। সেটির ও সম্পাদক ছিলেন বিদেশি উইলিয়াম কেরি। ১৭৮০ সালে ২৯ জানুয়ারি কলকাতা থেকে “বেঙ্গল গেজেট” নামক একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে “বেঙ্গল গেজেট” কে সর্বপ্রথম সংবাদপত্র বলা হয়। এর সম্পাদক ও মালিক ছিলেন জেমস অগাস্টাস হিকি।
১৭৮০ থেকে ১৮১৮ পর্যন্ত বাঙালি মালিকানাধীন কোন পত্রিকা ছিল না। ১৮১৮ সালে বাঙালি মালিকানাধীন” বাঙ্গল গেজেট”নামে প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। এটি ছিল সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশক ছিলেন গঙ্গা কিশোর ভট্রাচার্য্য। বাংলা ভাষায় প্রথম দৈনিক প্রকাশিত হয় ১৮৩৯ সালের ১৪ জুন। তার নাম ছিল দৈনিক “প্রভাকর”আর সম্পাদক ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। এর আগে ১৮৩৩ সালে প্রভাকর সাপ্তাহিক হিসাবে প্রকাশিত হয়। এদিক দিয়ে সাংবাদিকতায় সিলেট এক দূর্লভ গৌরবের অধিকারী।
বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশের ৫৭ বছর পর সিলেট থেকে প্রথম পত্রিকা প্রকাশিত হয়।”শ্রীহট্র প্রকাশ” এর পর ১৮৮০ সালে সিলেট থেকে প্রকাশিত হয় বিপিন চন্দ্র পালের “পরিদর্শক”পত্রিকা। সিলেট শহরের লালদীঘির পূর্ব পাড়ে একটি দু’তলা বাড়ির নীচতলায় ছিলো পত্রিকার অফিস আর উপর তলায় থাকতেন বিপন চন্দ্র পাল নিজে। এর পর সিলেট তথা শ্রীহট্রের মহকুমা শহর শিলচর থেকে ১৮৮৮ সালে প্রকাশিত হয় পাক্ষিক শিলচর পত্রিকা। এর সম্পাদক ছিলেন বিধু ভূষণ রায়।
১৯০৮ সালে শিলচর থেকে ‘শিলচর ‘ নামে আরেকটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। যার সম্পাদক ছিলেন ভগবতী চরন রায় গুপ্ত। সিলেট থেকে ১৮৮৯ সালে লালা প্রসন্ন কুমার দের সম্পাদনায় “শ্রীহট্র মিহির” ১৮৯৪ সালে গিরিশ চন্দ্র দাসের সম্পাদনায় “শ্রীহট্র বাসী”১৯০৭ সালে ভূবনমোহন বিদ্যার্ণবের সম্পাদনায় “দেশবার্তা”১৯২০ সালে সতীশচন্দ্র দেবের সম্পাদনায় “জনশক্তি” ১৯২৫ সালে মকবুল হোসেন চৌধুরীর সম্পাদনায় “যুগবাণী”এবং ১৯৩০ সালে তারই সম্পাদনায় সাপ্তাহিক যুগভেরী প্রকাশিত হয়।
১৯৩৯ সালের ৮ জুলাই প্রকাশিত “দৈনিক বলাকা”ই সিলেটের প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র। এর সম্পাদক ছিলেন কালীপ্রসন্ন দাশ। সিলেট থেকে দ্বিতীয় দৈনিক প্রকাশিত হয় ১৯৪০ সালে। সম্পাদক ছিলেন রমনী রঞ্জন শর্মা। ১৯৫২ সালে মৌলভী রজিউর রহমানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় “দৈনিক ইনকিলাব”। পত্রিকা তিনটি ছিল খুবই স্বল্পায়ু। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত সিলেট থেকে আর কোনো দৈনিক প্রকাশের তথ্য জানা যায় নি। প্রাচীনকাল থেকেই শিক্ষাদীক্ষায় ছিলো সিলেটের গৌরবময় ইতিহাস।
শ্রীহট্র বা সিলেটের প্রথম এম এ পাশ ব্যক্তি হলেন সিলেটের আখালিয়া এলাকার জয় গোবিন্দ সোম। সময়টা ছিল উনিশ শতকের শেষার্ধ। সে সময় সিলেটের সমাজ প্রত্যক্ষ করলো উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত প্রথম বিলাত ফেরত সিলেটি ছনখাই স্তামের গজনফর আলী ও জাপান ফেরত জলসুখা স্তামের রমা কান্ত রায় কে। এরা তৎকালীন সিলেটের নব প্রজন্মের মনোবল বৃদ্ধি করেছিলেন। সিলেট অঞ্চলে আধুনিক শিক্ষা প্রসারে তাদের অবদান ছিলো অপরিসীম।
লেখক: সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও পর্যটক।
Related News
নীরবতার এক অদৃশ্য আয়না
হক মোঃ ইমদাদুল, জাপান: বিদেশে বসবাসের অভিজ্ঞতা মানুষকে অনেক কিছু শেখায়, যার সবকিছু কোনো বইয়েRead More
জাপানের দরজা খোলা, চৌকাঠ উঁচু
হক মোঃ ইমদাদুল: বদলে যাওয়া জাপানে বিদেশিদের ভবিষ্যৎ কোথায়? জাপানের সঙ্গে দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সম্পর্ক যাঁদের,Read More



Comments are Closed