কমলগঞ্জে ভৌতিক বিল, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ভৌতিক বিদ্যুৎবিল আর ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির প্রায় এক লক্ষ গ্রাহক অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। লোডশেডিং ও ঝড়বৃষ্টি না থাকলেও ভ্যাপসা গরমে ভোর রাত, সন্ধ্যাসহ দিনে অন্তত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি যেখানে গ্রাহক মালিক, আজ সেই মালিকগন নানা বিড়ম্বনার শিকার। “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ”। বর্তমান সরকারের এই অভূতপূর্ব সাফল্য ¤øান করছে কতিপয় শ্রেণীর লোকজন। পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকগণ বড়ই অসহায়। তাদের অনেকেরই অভিযোগ আমলে নেয়া হয়না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসনকে এসব বিষয়ে তদারকি বা দেখভাল করা সময়ের দাবী। নয়তো গ্রাহকদের ভোগান্তির সীমা থাকবেনা।
জানা গেছে, মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কমলগঞ্জ জোনাল অফিসের আওতাধীন কমলগঞ্জ, কুলাউড়া ও রাজনগর উপজেলা একাংশের প্রায় ৯০ হাজার বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছে। জোনাল অফিস ভৌতিক বা অনুমাননির্ভর বিল দিয়ে প্রতিমাসে গ্রাহকদের হয়রানি করছে। এর থেকে রেহাই পাচ্ছে না কেউই। প্রতিদিন বিদ্যুৎ অফিসে গ্রহকরা গিয়ে বিল ঠিক করাতে হচ্ছে।
কমলগঞ্জ পল্লীবিদ্যুতের গ্রাহক সালাহ্উদ্দিন শুভ, নজমুল ইসলাম, বাবু মিয়া, নিমাই মালাকার, ছাদেক মিয়াসহ অর্ধশতাধিক গ্রাহকদের সাথে আলাপকালে ক্ষুব্ধ হয়ে অভিযোগ করে বলেন, ‘বিদ্যুৎ অফিসে বসে ও বাড়িঘরের মিটার ঠিকমতো রিডিং না করেই জুন ক্লোজিং এর নামে অনুমাননির্ভর অস্বাভাবিক অঙ্কের বিল তৈরি করে গ্রাহকদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ে দৌড়ঝাঁপ দিয়ে কেউ কেউ ভৌতিক বিল সংশোধন করে আনতে পারলেও অধিকাংশের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়না। অফিসের লোকজন অনেককে পরের মাসের বিলের সঙ্গে সমন্বয় করে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে বিদায় করে দিচ্ছেন। ফলে সংযোগ বিচ্ছিন্নের ভয়ে বাধ্য হয়ে নি¤œবিত্ত ও মধ্যবিত্ত এসব গ্রাহকরা এটাসেটা বিক্রি করে বিল পরিশোধ করছেন। সাধারণভাবে প্রতি মাসে তারা যে বিদ্যুৎ বিল পান গত এপ্রিল থেকে প্রায় দ্বিগুণ টাকার বিল হয়েছে মে-জুন মাসে।’
এদিকে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে নাজেহাল হয়ে পড়েছেন কমলগঞ্জের বিদ্যুৎ গ্রাহকরা। পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কমলগঞ্জ জোনাল অফিসের অধীনস্থ ২৫ মেগাওয়াট সাবস্টেশনটিকে ছয়টি ফিডারে ভাগ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে পৌরশহর ফিডারে অল্প ভোগান্তি হলেও বাকি ফিডারের আওতায় থাকা ইউনিয়নের গ্রাহকদের প্রতিনিয়ত বিদ্যুতের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। গত মে মাস থেকে তা চরম আকার ধারণ করেছে।
বিদ্যুৎ গ্রাহকরা বলেন, সার্ভিস চার্জ ও ভ্যাট ছাড়াও বিদ্যুৎ বিলের সাথে দীর্ঘদিন ধরে প্রতি মাসে দশ টাকা হারে মিটার ভাড়া ও নেওয়া হচ্ছে। অথচ টাকা দিয়ে মিটার কিনে নেওয়ার পরও মাসে মাসে আজীবন মিটার ভাড়া দিতে হচ্ছে। এসব বিষয়ে সঠিকভাবে তদারকি করারও কেউ নেই।
পৌর এলাকার বিদ্যুৎ গ্রাহক লেখক-গবেষক আহমদ সিরাজ, হোছন মিয়া, সাজু মিয়া, ইউনুছ মিয়া, দেলোয়ার হোসেন, রুবেল আহমদ, তাহির মিয়া, আলমগীর হোসেন, শমশেরনগর এলাকার প্রেমানন্দ দেবনাথসহ কয়েকজন বিদ্যুৎ গ্রাহক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘প্রায় প্রতিদিন ভোরে ও সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ করে ঘন্টাধিকাল পর চালু হয়। এছাড়া ঝড়-বৃষ্টি না থাকলেও রোজ অন্তত দুই-তিনবার বিদ্যুৎ চলে যায়। ভ্যাপসা গরমে বিদ্যুতের এমন ভোগান্তিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জরুরি মোবাইল নম্বর ছাড়াও ডিজিএম, এজিএম কমসহ অনেকের ফোনে কল দিলে কেউ তা রিসিভ করেননা। বিদ্যুৎ বিলের নামে গ্রাহকদের ধোঁকা দিচ্ছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। করোনা ভাইরাসের অজু হাতে আমাদের কাছ থেকে দুই মাসে দেড় থেকে দ্বিগুণ বিল বেশি নিচ্ছে। এমন ভৌতিক বিল এর আগে কখনো হয়নি। আমাদের মতো সহজ, সরল ও নি¤œ আয়ের লোকেরা অফিসে আসা যাওয়া করতে যাতায়াত খরচ ও একদিনের রোজ নষ্ট হয়ে যায়। অনেকে উপায়ান্তর না পেয়ে বাড়তি বিল দিতেও বাধ্য হচ্ছেন। তারা আরও বলেন, বর্তমানে করোনা মহামারির কারণে আয় রোজগার না থাকায় এমনিতেই সংঙ্কটে দিনযাপন করতে হচ্ছে। তার উপর একসাথে ২/৩ মাসের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা কস্টসাধ্য ব্যাপার। তারা ভৌতিক বিল সংশোধন, বিলম্ব মাশুল মওকূপ ও বিল পরিশোধের সময় বর্ধিত করার দাবি জানান।’
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণ সম্পর্কে সাবস্টেশনে দায়িত্ব পালনরত একাধিক লাইন টেকনিশিয়ান বা লাইনম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মাঝে মধ্যে লাইনে ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ বন্ধ থাকে।
মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সাবেক পরিচালক প্রভাষক মো: আব্দুল আহাদ বলেন, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের বেধেঁ দেওয়া টার্গেট আর বাড়তি বোনাস আর জিএম সাহেবরা বাহবা পাওয়ার ধান্দায় বলির পাঠা সাধারণ গ্রাহক। এই টার্গেট পূরণে পুরষ্কার নতুবা তিরস্কার এই নীতির কারণেই অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হয় সারা দেশব্যাপী। এ থেকে পরিত্রাণ কে দিবে, কে শুনাবে আশার বাণী? ক্ষেত্রবিশেষে রক্ষক যেখানে ভক্ষক সেখানে সাধারণ গ্রাহক হয়রানির শিকার না হয়ে যাবে কোথায়। বিশেষ করে জুন আসলেই শুরু হয় এহেন সভ্য জুলুমবাজী। জুন আসলেই কেন ভুতুড়ে বিল। ব্যবহার যা হয় তার চাইতে কেন বাড়তি বিল উঠানো হয়। সঞ্চালন লাইনে কোন সমস্যা না থাকলেও অসত্য তথ্য দিয় ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। জুন আসলেই লাইন মেরামতের প্রয়োজন হয়। আর জরুরি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে ঘনঘন সারাদিন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। বিআরইবির টার্গেট ফিলাপে সিষ্টেম লস কমানোর স্বার্থে এমন অনিয়ম কোন অবস্থাতেই মানা যায় না। কালো আইন করে সমিতির জনপ্রতিনিধি (এলাকা পরিচালক) সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে প্রতি উপজেলায় একজন। এলাকা বিশেষ ৩/৪ বছর ধরে অনেক পরিচালকের পদ শূণ্য। যারা আছেন তাদের যথাযথ ভ‚মিকার অভাবে আজ গ্রাহকদের ভোগান্তি সীমাহীন। আবার কোন কোন সময় তাদের মতামত গ্রহণ করা হয় না। একময় গ্রাম উপদেষ্টা ছিলেন তারা সমিতির কর্মকাÐে যথেষ্ট ভুমিকা রাখতেন। আজ সেই পদও বিলুপ্ত।
লেখক-গবেষক আহমদ সিরাজ বলেন, ইদানিং অনেকেই অভিযোগ করছেন বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের জন্য কোন গ্রাহকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলে সেই বিলের টাকা তার ভাইয়ের বিলে ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে, তা সমিতির কোন আইনে আছে আমার জানা নাই। আদায় না হলে ঐ গ্রাহকের (ভাইেয়র) বিল আদায় থাকলেও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে যা সত্যিই অমানবিক, জুলুমের নামান্তর মাত্র। এছাড়া মিটারের যান্ত্রিক ক্রুটির কারনে বেশি রিডিং নিলেও মাসের পর মাস বাড়তি বিল দিতে হয় গ্রাহককে। আর অভিযোগ করলে বাড়তি বিলসহ সমুদয় টাকা পরিশোধ করে মিটার পরীক্ষার জন্য গুণতে হয় আরো দুশো টাকা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কমলগঞ্জ জোনাল অফিসের ডিজিএম গোলাম ফারুক মীর বলেন, ‘প্রত্যেক গ্রাহকের মিটার দেখে বিদ্যুৎ বিল তৈরির জন্য আমাদের ৪২ জন মিটার রিডার রয়েছেন। মাঝে মধ্যে বিল রিডিংয়ে সমস্যা হতে পারে। তবে অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ নিয়ে কেউ অফিসে আসলে তাৎক্ষণিক তা সংশোধন করে দেন অথবা পরের মাসের বিলে সমন্বয় করে দেয়া হয়। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ব্যাপারে বলেন, এক মাসের মধ্যে এ সমস্যা থাকবে না।’
Related News
শ্রীমঙ্গলের ভুনবীর ইউনিয়নে ফলদ, ভেষজ ও বনজ বৃক্ষচারা বিতরণ
সালেহ আহমদ (স’লিপক): পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং সবুজ বিপ্লব জোরদারের লক্ষ্যে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ২নংRead More
নিখোঁজের ৩০ ঘণ্টা পর ধলাই নদী থেকে টমটম চালকের মরদেহ উদ্ধার
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ব্যাটারিচালিত টমটমসহ ধলাই নদীতে পড়ে নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ৩০ ঘণ্টাRead More



Comments are Closed