Main Menu

সবার ক্ষেত্রে চুরি, না কারো কারো ক্ষেত্রে অপবাদ?

সৈয়দ মবনু: একজন চোর কিংবা একদল চোরের পক্ষে উকালতি করা কোনভাবেই চুরি থেকে কম অপরাধ নয়। আবার কাউকে অনুমানের উপর চোর চিহ্নিত করাও একটি বড় অপরাধ। কাউকে চুর বলতে হলে প্রথমে স্পষ্ট প্রমাণ করতে হবে সে চুরি করেছে অথবা চুরির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। যদি স্পষ্ট প্রমাণিত না হয় তবে কাউকে চোর বলা যাবে না। স্বাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া কাউকে চোর বলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে সন্দেহজনকভাবে পুলিশ একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিশেষ ক্ষমতায় সম্মানের সাথে গ্রেফতার করতে পারে। তবে কাউকে সন্দেহের ভিত্তিতে চোর বলতে পারবে না। আর আদালত কর্তৃক কেউ অপরাধী চিহ্নিত না হলে তাকে অপরাধী অর্থাৎ চোর বলা যাবে না।

বর্তমান সামাজি মাধ্যম ফেসবুক কিংবা ইউটুব খুললেই দেখা যায় চাউল চুরি এবং ত্রাণ চুরি নিয়ে প্রচুর হৈ চৈ হচ্ছে। যা রটছে তাঁর কিছু যে ঘটছে না, তা কিন্তু নয়। আমি একথা বলছি না যে, কেউ না কেউ চাউল চুরি করছে না। তবে আমি বলছি কাউকে চুর ঘোষণার আগে দেখতে হবে এটা প্রকৃত চুরি না অপবাদ?

চুরি না অপবাদ পরিস্কার করতে হলে বিষয়কে সতর্কতার সাথে তাথ্যিক পর্যবেক্ষণ করতে হবে। গোটা ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্যা সনাক্ত করে বিশ্লেষণ করতে হবে। যারা বিচার-বিশ্লেষণ করবেন তারা জানতে হবে, যে পরিমাণ ত্রাণ বা চাউল পাওয়া গেছে এই পরিমাণ ত্রাণ বা চাউল তার কাছে এলো কীভাবে? সরকারী ত্রাণ নিশ্চয় সরকারী হুকুম ও সরকারের নীতির বাইরে আসেনি? যদি সরকারী নীতিতে এসে থাকে তবে প্রশ্ন, যার কাছে জিনিষ যে পরিমাণ পাওয়া গেলো তিনি সেই পরিমাণ জিনিষ পাওয়ার যোগ্য কি? যদি যোগ্য হন তবে প্রশ্ন, এই পরিমাণ জিনিষ কতদিনে বন্টন সম্ভব এবং এক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশিকা কি? যদি একদিনে তা বন্টন সম্ভব না হয় তবে একদিনের বন্টনের জিনিষের অতিরিক্তগুলো কোথায় সংরক্ষণ করতে সরকার নির্দেশনা দিয়েছে?

যদি একদিনে বন্টনের অতিরিক্ত জিনিষ সংরক্ষনের ক্ষেত্রে সরকার কোন নির্দিষ্ট নির্দেশিকা না দেয়, আর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি তার পছন্দের স্থানে সংরক্ষণ করে এবং এই অবস্থায় পুলিশ বা আদালত তা জব্ধ করে তবে কি এই দায়িত্বশীলকে চোর বলা যাবে? বাংলাদেশের সবগুলো ইউনিয়নের কি নিজস্ব গোদাম আছে? আমার জানা মতো অনেক ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব ভবনই নেই। যদি কোন ইউনিয়ন অফিসের নিজস্ব গোদাম না থাকে সে ক্ষেত্রে যদি চেয়ারম্যান বা মেম্বার তা নিজের পছন্দের জায়গায় সংরক্ষণ করেন, আর এই অবস্থায় তা জব্ধ করা হয় তবে কি তাদেরকে অপরাধী বলা যাবে?

আমি এই কথাগুলো কোন চুরকে রক্ষার জন্য বলছি না। আমি একথাগুলো বলছি দুটি কারণে। প্রথম কারণ, অনেক ভদ্রলোক চেয়ারম্যান-মেম্বার সরকারী ত্রাণের দায়িত্ব নিতে ভয় পাচ্ছেন, যদি কিছু ঘটে যায়? মামলা-মকদ্দমা শেষে হয়তো প্রমাণিত হবে তা চুরি নয়, ছিলো সংরক্ষণ। কিন্তু এর আগে তো মিডিয়ায় চুর হিসাবে প্রচার হয়ে যাবে। মিডিয়াওয়ালারা চোর প্রমাণে যে প্রচার দিবেন, মামলা জিতার পর চোর নয় তা প্রমাণে তো একটু সংবাদও করবেন না। ফলে মামলায় জয়ি হওয়ার পরও প্রচারে চোর থাকা হবে।

দ্বিতীয় কারণ, ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে মিথ্যা সাক্ষ্য এবং মিথ্যা অপবাদ দুটিই কবীরা গুনাহ বা বড় পাপের অন্তর্ভুক্ত। হযরত ইবনে হাজর আসকালানি (র.) বলেন; عدّ شهادة الزّور وقبولها، كلاهما من الكبائر
অর্থাৎ : মিথ্যা সাক্ষ্যদাতা ও গ্রহণকারী উভয় সমান অপরাধী ও তারা কবিরাগোনাহকারী হিসাবে সাব্যস্ত হবে।
হাদিসে রাসুল (স.) এ উল্লেখ রয়েছে,
: قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم أَلاَ أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ ثَلاَثًا قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ وَجَلَسَ ، وَكَانَ مُتَّكِئًا فَقَالَ أَلاَ وَقَوْلُ الزُّورِ قَالَ فَمَا زَالَ يُكَرِّرُهَا حَتَّى قُلْنَا لَيْتَهُ سَكَتَ.

অর্থাৎ : একবার রাসুল (স.) হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। এ অবস্থায় তিনি সাহাবাদের বললেন, বড় গোনাহ সম্পর্কে কি আমি তোমাদের বলব? সাহাবাগণ বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ বলুন। তিনি বললেন, বড় গোনাহের অন্তর্ভুক্ত হল কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ স্থির করা, অর্থাৎ শিরক করা, মাতা-পিতার নাফরমানী করা, অতঃপর সোজা হয়ে বসলেন এবং বললেন, মিথ্যা সাক্ষী দেওয়া (একথা তিনবার বললেন) ( সহীহ বোখারি : ২৬৫৪)।
মিথ্যা অপবাদকারী সম্পর্কে হাদিসে রাসুলে উল্লেখ রয়েছে;

قَالَ أَتَدْرُونَ مَنِ الْمُفْلِسُ ؟ ” قَالُوا: الْمُفْلِسُ مَنْ لَا دِرْهَمَ لَهُ وَلَا مَتَاعَ ، فَقَالَ: ” إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا وَقَذَفَ هَذَا، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا، وَضَرَبَ هَذَا فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ، ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ

হযরত রাসুল (স.) বলেন, তোমরা কি জান গরীব কে? সাহাবীগণ বললেন, আমাদের মধ্যে যার সম্পদ নাই সে হলো গরীব। তখন রাসুল (স.) বলেন, আমার উম্মতের মধ্যে সে হলো গরীব যে, কিয়ামতের দিন নামায, রোযা ও যাকাত নিয়ে আসবে অথচ সে অমুককে গালি দিয়েছে, অমুককে অপবাদ দিয়েছে, অন্যায়ভাবে লোকের মাল খেয়েছে, সে লোকের রক্ত প্রবাহিত করেছে এবং কাউকে প্রহার করেছে। কাজেই এসব নির্যাতিত ব্যক্তিদেরকে সেদিন তার নেক আমল দিয়ে দেয়া হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সুনান আততিরমীযি : ২৪১৮)।

অন্য হাদিসে উল্লেখ রয়েছে;
وَمَنِ ادَّعَى قَوْمًا لَيْسَ لَهُ فِيهِمْ نَسَبٌ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ

অর্থ : যে ব্যক্তি কোন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোন বানোয়াট অভিযোগ আনলো, সে যেন নিজেই নিজের স্থান জাহান্নামে করে নিল। (সহীহ বোখারী:৩৫০৮)।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহপাক বলেন,

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ ٱلۡعِجۡلَ سَيَنَالُهُمۡ غَضَبٞ مِّن رَّبِّهِمۡ وَذِلَّةٞ فِي ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَاۚ وَكَذَٰلِكَ نَجۡزِي ٱلۡمُفۡتَرِينَ ١٥٢ ﴾ [الاعراف: ١٥٢]

অর্থ : নিশ্চয় যারা গো বাছুরকে (উপাস্য হিসাবে) গ্রহণ করেছে, দুনিয়ার জীবনে তাদেরকে আক্রান্ত করবে তাদের রবের পক্ষ থেকে গযব ও লাঞ্ছনা। আর এভাবে আমি মিথ্যা রটনাকারীদের প্রতিফল দেই। (সূরা আলআরাফ :১৫২)।

তাই আমাদের উচিৎ কারও বিরুদ্ধে কিছু প্রচারের পূর্বে সমস্যা সনাক্ত করে বিশ্লেষণ করা এবং ফাঁক ও ঘাটতি মেরে বিচার-বিশ্লেষন করে ফলাফলে যাওয়া। কিছু একটা দেখেই লাফ দিয়ে প্রচার না করা। আপনার প্রচারের কারণে একজন ভালো মানুষের যদি ইজ্জতের হানি ঘটে তবে একদিকে এই ভদ্রলোকের ক্ষতি হবে, অন্যদিকে আপনি জাহান্নামের আগুনের উপযুক্ত হবেন এবং কিয়ামতের মাঠে আপনার জীবনের সকল আমল তাকে তারা পাপের বিনিময় দিয়ে যাবেন। তবে সাথে সাথে তাও স্মরণ রাখতে হবে, যারা প্রকৃত চোর ওদেরকে ক্ষমা করা যাবে না। কারণ তাদের অপরাধ অবশ্যই শাস্তিযোগ্য। আল্লাহ আমাদেরকে মিথ্যা স্বাক্ষী এবং অপবাদ দেওয়া থেকে রক্ষা করুন।

Share





Related News

Comments are Closed