করোনাভাইরাস : অামি কী করতে পারি
স্বপন তালুকদার: করোনাভাইরাস সংক্রমন প্রতিরোধে অামার অাপনার দায়িত্ব সরকারের চেয়ে অনেক বেশি এবং গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের একার পক্ষে অামাদের সহযোগিতা ব্যতিত করোনা নিয়ন্ত্রনে নিয়ে অাসা সম্ভব নয়। অামাদের অনেকেই করোনাভাইরাস সংক্রামন প্রতিরোধে প্রাথমিক করণীয় রীতিনীতি মেনে চলছি না। যার যখন খুশি প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে মাস্ক ছাড়াই বেরিয়ে পরছি। মুদির দোকানে ভিড় করে করোনাভাইরাস সংক্রমনের ঝুকি নিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে পাঁচ গুণ পণ্য সামগ্রী কিনছি। দ্রব্যমূল্য লাগাম ছাড়া বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছি বিবেকহীনের মতো। যা একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দায়িত্বহীনতারই সামিল। যার পরিনাম কখনই শুভ হতে পারে না।
করোনাভাইরাস সংক্রমণে বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় স্তরে। এখনো স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে (কমিউনিটি) সংক্রমণ সে অর্থে শুরু হয়নি। কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হলে তা হবে তৃতীয় স্তরে। ইতালিসহ বিভিন্ন দেশ এখন সংক্রমণের তৃতীয় স্তরে রয়েছে। যদি সারা দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সংক্রমণ ঘটে, তখন তা হবে স্তর চতুর্থ। তৃতীয় বা চতুর্থ স্তরে নেমে গেলে কিন্তু কিছুই করার থাকবে না।
এখন আমাদের উচিত কীভাবে সংক্রমণকে দ্বিতীয় স্তরে আটকে রাখতে পারি তা দেখা। এ জন্য সরকারি, বেসরকারির পাশাপাশি রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, স্বাস্থ্যকর্মী ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিভিন্ন দায়িত্ব রয়েছে। এসব দায়িত্ব যদি সঠিকভাবে পালন করতে পারি, তাহলে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি আমরা দ্বিতীয় স্তরে আটকে রাখতে পারব। নিয়ন্ত্রণ করতে পারব।তাই সবারই করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রনে রাখতে স্ব স্ব অবস্থান থেকে দায়িত্ব রয়েছে।
অামাদের মত সাধারণ নাগরিকদের উচিত প্রথমে নিজের পরিবারকে কোনোরূপ প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যেতে না দেওয়া। প্রয়োজনে গেলেও যত দ্রুত সম্ভব কাজ শেষ করে বাসায় ফিরে অাসা। বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করা। বাইরে থেকে ফিরে হাত পা মুখ ভালো করে সাবান দিয়ে পরিস্কার করা। জামা কাপড় পরিবর্তন করা।
করোনাভাইরাসে অাক্রান্তদের মৃত্যুর হার খুব একটি বেশি নয় তা ২ শতাংশ। তাই সকলের একটু দায়িত্বশীল অাচরণ করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন হবে।
করোনাভাইরাস নতুন তাই এর তেমন কোনো চিকিৎসা ডাক্তারেরা দিতে পারছেন না। যদিও বেশ কয়েকটি দেশ গবেষনা করে চিকিৎসার প্রয়োজনীয় কার্যকর ঔষধ তৈরি করতে পারছেন বলে দাবি করছেন। তাই অামাদের সচেতনতা ব্যতিত এখন কোনো সহজতর উপায় অামাদের হাতে কাছে নেই। ডাক্তার বা হাসপাতলে গেলেও অামরা তেমন কোনো জোরালো সুবিধা পাবো না। তাই হালকা সর্দি কাশি থাকলে গরম জল ব্যবহার করতে পারি এবং সর্দি কাশির হালকা জাতীয় ঔষধ সেবন করতে পারি। সাথে স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে শরীরের যথেষ্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারি। তেমনই পাশের বাসায়ও সচেতনতা স্বরূপ অনুরূপ পরামর্শ দেওয়া। যদি পাড়ায় বা পাশের বাড়িতে সদ্য বিদেশ ফেরত কেউ এসে থাকে তাকে হোম কোয়ারেন্টাইন মানতে বুঝানো বা স্থানীয় প্রসাশনকে জানানো এবং বিদেশ ফেরতদের তালিকা প্রস্তুত করে দিতে পারি, অর্থাৎ বিদেশ ফেরতদের নিয়ন্ত্রনে রাখা। সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্টানে দায়িত্ব প্রাপ্তদের (ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মি রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা) যার যা দায়িত্ব রাষ্ট্র নির্ধারিত করে দিয়েছে তা যদি সঠিক ভাবে উনারা সম্পন্ন করা যায় সবাই যদি স্ব স্ব জায়গা থেকে অামরা অামাদের দায়িত্ব সচেতনতার সাথে পালন করি অামরা দেশকে দ্বিতীয় পর্যায়ে ধরে রেখে করোনাভাইরাস সংক্রমন প্রতিরোধে সক্ষম হবো।
করোনাভাইরাসে কেহ অাক্রান্ত কিনা তা পরীক্ষার চেয়েও জরুরি জনসচেতনতা। পরীক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত কিট হাসপাতালেও যথেষ্ট মজুদ নেই এই মুহূর্তে।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত চিকিৎসক দেবী শেঠীর মতে, সঙ্গে কাশি ও গলায় সমস্যা হবে। পঞ্চম দিন পর্যন্ত মাথা যন্ত্রণা। পেটের সমস্যাও হতে পারে। ষষ্ঠ বা সপ্তম দিনে শরীরে ব্যথা বাড়বে এবং মাথা যন্ত্রণা কমতে থাকবে। তবে ডায়েরিয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। পেটের সমস্যা থেকে যাবে। এবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অষ্টম ও নবম দিনে সব লক্ষণই চলে যাবে। তবে সর্দির প্রভাব বাড়তে থাকে। এর অর্থ আপনার প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়েছে এবং আপনার করোনার আশঙ্কা নেই। উপমহাদেশের এই বিখ্যাত চিকিৎসকের মতে, এমন সময়ে আপনার করোনাভাইরাসের পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। কারণ আপনার শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গেছে। যদি অষ্টম বা নবম দিনে আপনার শরীর আরও খারাপ হয়, করোনা হেল্পলাইনে ফোন করে অবশ্যই পরীক্ষা করে নিন।
তাই করোনাভাইরাস সংক্রমন প্রতিরোধে অামাদের প্রাথমিক করনীয়:
১. বারবার করে সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া। সংস্থাটির নির্দেশনা: কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুতে হবে।
২. নাক, চোখ, মুখে হাত না দেওয়া।
৩. পারতপক্ষে ঘরের বাইরে না যাওয়া। ভিড় এড়িয়ে চলা। অন্য মানুষের থেকে কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখা।
৪. হাঁচি-কাশির সময় নিজের কনুইয়ের ভাঁজ দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে ফেলা।
৫. যেখানে সেখানে থুতু কফ না ফেলা।
৬. মাছ, মাংস, দুধ, ডিম কাঁচা না খাওয়া। কাঁচা ফল, সবজি খুব ভালো করে ধুয়ে নেওয়া। ৭. আপাতত বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ রাখা। বিদেশ থেকে এলে নিজের ঘরে একা থাকা। অন্য কাউকে তিন ফুটের মধ্যে আসতে না দেওয়া।
করোনাভাইরাসের প্রতিরোধ বিচ্ছিন্ন করণ, বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং বিচ্ছিন্ন থাকা। অথচ করোনাভাইরাস নিয়ে ভুল তথ্য ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে। কোনো প্রকার গুজব বা অপ্রচারে প্রভাবিত হওয়ার অাগে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করুন, অাপনার কি করণীয়। ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিবেন নাকি অন্য কোনো কু-সংস্কারাচ্ছন্ন বকধার্মীকের। মনে রাখবেন এটা প্রকৃতি প্রদত্ত একটি প্রাণঘাতি ভাইরাস।
যদি অামরা দ্বিতীয় স্তরে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সক্ষম না হই বা অামাদের অসচেতনতায় ব্যর্থ হয় তবে দেশ ও জাতির ভাগ্যাকাশে কতটা কালো মেঘ জমে অাছে তা সময়ই বলে দিবে।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট
Related News
নীরবতার এক অদৃশ্য আয়না
হক মোঃ ইমদাদুল, জাপান: বিদেশে বসবাসের অভিজ্ঞতা মানুষকে অনেক কিছু শেখায়, যার সবকিছু কোনো বইয়েRead More
জাপানের দরজা খোলা, চৌকাঠ উঁচু
হক মোঃ ইমদাদুল: বদলে যাওয়া জাপানে বিদেশিদের ভবিষ্যৎ কোথায়? জাপানের সঙ্গে দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সম্পর্ক যাঁদের,Read More



Comments are Closed