Main Menu

৩০ এতিমকে উড়োজাহাজে ভ্রমণ করাল বিমান

বৈশাখী নিউজ ডেস্ক : আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো ওদের। ওরা সুপরিসর উড়োজাহাজে করে আকাশপথ ভ্রমণ করল। ওরা সুবিধাবঞ্চিত, এতিম শিশু। যাদের কাছে এটা ছিল স্বপ্নের মতো। কখনও ভাবেনি তারা বিমানে করে আকাশে উড়বে। শেষ পর্যন্ত তাদের সেই আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। আর তাই বিমানে ভ্রমণ করে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভাসছে কোমলমতি ওই শিশুরা। আকাশ ভ্রমণের পর তারা নতুন স্বপ্ন দেখছে বিমানের পাইলট, প্রকৌশলী কিংবা বিমানবালা হওয়ার।

শনিবার (২৭ মে) রাজধানীর মিরপুর ও তেজগাঁওয়ের দুইটি সরকারি শিশু পরিবারের ৩০ এতিম শিশুকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অত্যাধুনিক উড়োজাহাজে আকাশপথ ভ্রমণ করানো হয়েছে। ঢাকা থেকে সিলেট এবং সিলেট থেকে ফের ঢাকায় এসে পৌঁছে ওই শিশুরা। আর এই পুরো সময়টুকু তাদের কাছে যেন স্বপ্নের মতো। জীবনের শ্রেষ্ঠ ও স্মরণীয় দিন বলেও মন্তব্য করেছে শিশুরা। এদিকে এতিম এ শিশুদের নতুন স্বপ্ন পূরণেও পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ এম মোসাদ্দিক আহমেদ। ভ্রমণ শেষে শনিবার দুপুরে বলাকা ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। এ সময় শিশুদের আসন্ন ঈদের পোশাকসহ নানা উপহার দেন মোসাদ্দিক আহমেদ।

সফরসঙ্গী হয়ে দেখা গেছে, শনিবার ভোর ৪টার মধ্যেই দুই গ্রুপে ১৫ ছেলে ও ১৫ মেয়েশিশু তাদের আম্মাদের (উপতত্ত্বাবধায়ক) সঙ্গে চলে আসে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ (ডোমেস্টিক) টার্মিনালে। ছেলেদের সাদা শার্ট, নীল প্যান্ট, সাদা কেডস্ ও গলায় টাই ঝোলানো ছিল। আর মেয়েশিশুদের সাদা ও মিষ্টি গোলাপি রঙের পোশাকে পরীর মতো করে আনা হয়েছিল। বিমানবন্দর টার্মিনালে এসেই তারা আনন্দে ভাসছিল। কেউ কেউ আনন্দে গাইছিল গান। এ সময় মিরপুর শিশু পরিবারের শিশু জিকর শেখ বলে, ‘এত ভালো লাগছে যে বোঝানো সম্ভব নয়। কখনও ভাবিনি, বিমানে চড়তে পারব। আজ স্বপ্ন পূরণ হবে, ভাবতেই কেমন যেন লাগছে।’ অন্যদের কণ্ঠেও ছিল প্রায় অভিন্ন মন্তব্য ও আনন্দ-উচ্ছ্বাস।’

এরপর শনিবার ভোর পৌনে ৫টায় শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের (বিজি ১৬০৫) ফ্লাইটে ‘ময়ূরপঙ্খী’ নামক উড়োজাহাজে করে ৩০ এতিম শিশু-কিশোর সিলেটের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করে। আকাশের উপরের দিকে যতই বিমান উঠছিল, ততই আনন্দিত হচ্ছিল শিশুরা। অবাক বিস্ময়ে জানালা দিয়ে আকাশ দেখছিল তারা। এ শিশুদের জন্য উড়োজাহাজে ছিল বিশেষ ব্যবস্থাপনা। বিশেষ নাস্তা ও পরিচর্যাও ছিল। মেঘের কোল ছেড়ে আকাশে ভাসছিল তারা। মাত্র ৩৫ মিনিটের মধ্যেই উড়োজাহাজটি সিলেটে পৌঁছে অবতরণ করে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখানে ফুল দিয়ে শিশুদের শুভেচ্ছা জানান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তারা। এরপর উড়োজাহাজ থেকে তাদের আনন্দের যেন বাঁধ ভেঙে যায়। কী করবে না করবে, বুঝে উঠতে পারছিল না।

এ সময় প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে উড়োজাহাজ ভ্রমণকারী ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী (এতিম শিশু) মেহেরুন নেছা বলেছে, ‘কতটা ভালো লেগেছে তা মুখে প্রকাশ করতে পারব না। এটা স্বপ্নের মতো লাগছে। এখনও নিজের প্রতি বিশ্বাস হচ্ছে না। সত্যিই কি আমি প্লেনে চড়ে আসলাম?’ মেহেরুন আরও জানায়, আগে তার ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু উড়োজাহাজে ভ্রমণের পর এখন সে বিমানের পাইলট হতে চায়। এজন্য সে পড়ালেখা করে যাবে।

অপর শিশু ৫ম শ্রেণীতে পড়–য়া সাথী আক্তার তার প্রতিক্রিয়ায় বলে, এমন স্বপ্ন দেখা আমাদের সাজে না। তবুও জীবনের বড়ই আশা ছিল বিমানে চড়ার। সেটি বিমান কর্তৃপক্ষ পূরণ করল। এটা যেন নিজের কাছেই বিশ্বাস হচ্ছে না। আরেক শিশু ইমু আক্তার সাদিকা। সরকারি শিশু পরিবারের এই শিশু তেজগাঁওয়ের শহীদ মনু মিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। সাদিয়া ভ্রমণের প্রতিক্রিয়ায় বলে, ‘এ এক অন্যরকম ভালো লাগা। স্বপ্নের মতো লাগছে।’

মিরপুর শিশু পরিবারের শিশু মোঃ শাহাবুদ্দিন বলেছে, ‘বাস্তবে কখনও ভাবিনি যে বিমানে ঘুরতে (ভ্রমণ) পারব। ব্যাপারটা স্বপ্নের মতোই মনে হচ্ছে। এত ভালো লাগছে যে বলে বোঝাতে পারব না।’ শাহাবুদ্দিন মিরপুরে বাংলাদেশ-জার্মানি টেকনিক্যালে দশম শ্রেণীতে পড়ছে। এখন তার নতুন স্বপ্ন বড় হয়ে সে বিমানের প্রকৌশলী হতে চায়। সিলেটে পৌঁছে শিশু (৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র) সাকিব হোসেন বলেছে, ‘আমি একদিন বিমান চালাব। আগে চিন্তা করতাম ডাক্তার হবো। কিন্তু না, আমি পাইলট হবো।’

ঢাকা থেকে সিলেটে পৌঁছার পর ফ্লাইটটির ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইউম বলেন, ‘এটা আমার কাছে অন্যরকম এক ভালো লাগা। এমন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের উড়োজাহাজে ভ্রমণ করাতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করছি। শিশুদের বিমানের ককপিটেও নেয়া হয়েছিল। তাদের সবকিছু দেখিয়েছি। এমনকি যখন বিমানটি আকাশে উড়ছিল, সে সময় তারা ব্যাপক কৌতূহল ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিল।’

এ ফ্লাইটের পাস্ট অফিসার রাইয়ান বলেন, এই শিশুদের উড়োজাহাজ ভ্রমণটি তাদের নিজেদের জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ধারণেও কাজে দেবে। এমন একটি মহতি কাজে তিনিও শরিক হতে পেরে আনন্দিত বলে মন্তব্য করেন।

এরপর দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে বিশেষ আমন্ত্রিত ওই শিশুদের নিয়ে অত্যাধুনিক বোয়িং বিমান-৭৭৭ যোগে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয় উড়োজাহাজ ‘পালকি’। ১২টা ৪৫ মিনিটে ফ্লাইটটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সেখান থেকে শিশুদের নেয়া হয় বিমানবন্দর সংলগ্ন বিমানের প্রধান কার্যালয় বলাকায়। সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রতিক্রিয়া জানতে চান বিমানের এমডি ও সিইও এ এম মোসাদ্দিক আহমেদ।

এসময় মোসাদ্দিক আহমেদ শিশুদের উদ্দেশ করে জিজ্ঞাসা করেন, তোমাদের বিমানে ভ্রমণ কেমন লাগল? জবাবে তারা প্রায় সবাই একসঙ্গে বলে ওঠেÑ খুবই ভালো লেগেছে। স্বপ্নের মতো লেগেছে। এ সময় এক শিশু বলে ওঠে ‘ওপরে আকাশ, নিচে আকাশ, মাঝখানে আমি প্লেনে উড়ছি। ভাবতেই কেমন যেন লাগছিল। এমন ভালো লাগা কখনোই ভুলব না। আমাদের তো কেউ নেই, কেউ আমাদের বিমানে ভ্রমণ করাত না। আমরা বিমানে ঘুরতে পেরে এত আনন্দিত, তা বলে বোঝাতে পারব না।’

বিমানের এমডি ও সিইও এ এম মোসাদ্দিক আহমেদ তাদের উদ্দেশে বলেন, এমন আরও অনেক অসহায় শিশু আছে, যারা কখনোই হয়তো উড়োজাহাজে ভ্রমণ করতে পারবে না। তারপরও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স চেষ্টা করবে এ ধারাবাহিকতা রক্ষা করার।

শিশুদের ঢাকা থেকে সিলেটে নেয়া এবং সিলেট থেকে ঢাকায় নিরাপদভাবে পৌঁছা পর্যন্ত সব কাজ দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ। তিনি শিশুদের সঙ্গে বন্ধুসুলভভাবে মিশে তাদের আনন্দে মাতিয়ে রাখেন। শাকিল মেরাজ বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোরদের জন্য ব্যতিক্রম এ আয়োজন করেছে। বিমানের রয়েছে মজবুত ও স্থায়ী সামাজিক দায়বদ্ধতাবোধ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি বিমান সামাজিক উন্নয়নে অংশীদারিত্ব রেখেছে।

মিরপুর শিশু পরিবারের উপতত্ত্বাবধায়ক নাসিমা আক্তার ও তেজগাঁও শিশু পরিবারের উপতত্ত্বাবধায়ক ঝর্ণা জাহিন বলেন, তারা এই শিশু-কিশোরদের ‘মা’ বা আম্মা। এ শিশুরা তাদের নিজের সন্তানের মতোই। শিশুরাও তাদের নিজের মায়ের মতোই জানে। নাসিমা ও ঝর্ণা বলেন, ব্যতিক্রমী এবং সুবিধাবঞ্চিত এমন শিশুদের উড়োজাহাজে ভ্রমণের সুযোগ করে দেয়ায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। তারা এমন ভালো ও মহৎ কাজ আর করুক।

সিলেটে চা বাগান ও দর্শনীয় স্থানে ঘোরাফেরা : খুব সকালে সিলেটে পৌঁছে যায় এ শিশুরা। তাদের নেয়া হয় পর্যটন করপোরেশনের মোটেলে। সেখানে নাস্তা ও সামান্য বিশ্রাম শেষে আটটি মাইক্রোবাসযোগে এতিম শিশু, সফরসঙ্গী সাংবাদিক এবং বিমানের কর্মকর্তারা মিলে পরিদর্শনে যাওয়া হয় বিখ্যাত ‘ন্যাশনাল টি-গার্ডেনে’ (লাক্কাতুরা চা বাগান)। কয়েক কিলোমিটার আয়তনের এ চা বাগানের ভেতরে রাস্তা বেয়ে গাড়ি এগোতে থাকে। সারি সারি পাহাড়-টিলার গায়ে লেপ্টে থাকা চা বাগান। অপরূপ-মনোরম এ প্রকৃতি দেখে বিমুগ্ধ শিশুরাসহ সবাই।

৩০ শিশুরা হচ্ছে : তেজগাঁও শিশু পরিবারের লাবণী আক্তার, সাথী আক্তার, রনি আক্তার, শিফা মনি, সাদিয়া আক্তার ইমু, হামিদা খানম, আফছানা আক্তার, তাহমিনা আক্তার রচনা, মেহেরুন নেছা, তানজিনা আক্তার, শাহিদা আক্তার, আসমাউল হুসনা, সুরমা আক্তার, সোনিয়া আক্তার ও সোমা আক্তার। এছাড়া মিরপুর শিশু পরিবারের ১৫ শিশু হচ্ছে শাকিল, বিজয় হোসেন, জিকরুল হোসেন, মেহেদী হাসান, শাহীন মিয়া, সালমান হোসেন, শিহাব উদ্দিন, অন্তর মিয়া, মুন্না শেখ, সাকিব মিয়া, তুনাজ মিয়া, সোহেল মিয়া, রুহুল মিয়া, মোঃ ফারুক ও রহমান মিয়া।

Share





Related News

Comments are Closed