Main Menu

বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস এবং প্রাসঙ্গিক কথা

পিযুষ চক্রবর্তী: বিশ্বজুড়ে মানব উৎপত্তির বংশপরমপরা ভূমিষ্ট থেকে অপ্রাপ্ত বয়স পর্যন্ত শিশু কাল। আর এ সময়টি মানবের খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় দৈহিক মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটে। একটি শিশু শুধুমাত্র তার নিজের জন্য নয় পরিবার, সমাজ তথা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জন্য ক্রমশ উপযোগী হয়ে ওঠার এবং পরিপক্কতা অর্জনের বিকাশ মান সময়। সাধারণত ভূমিষ্ট থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত শিশুসুলভ বয়স ধরা হলেও দৈহিক এবং মানসিক বিচার বোধের দিক দিয়ে আঠার অনূর্ধ্ব সময় বা বয়সকে শিশু বলা হয়। এছাড়া শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ীও জাতিসংঘ কর্তৃক একজন শিশুর বয়স আঠারো বছর। রাষ্ট্রীয় ভাবে বাংলাদেশেও আঠারো বছর আগে নাগরিকত্ব সনদ লাভ করা যায় না এবং মেয়েদের বিয়ের বয়স বাধ্যতামূলক আঠারো বছর করা হয়েছে। এমনকি এর পূর্বে বিয়ে আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। শ্রম বিমুখ জীবন অকর্মণ্য , অপদার্থ, অবহেলার তথাপিও শিশু শ্রম সম্পর্কে সবাইকে বুঝতে হবে যে এ সময়টা বেড়ে ওঠার ও শারীরিক মানসিক দিক দিয়ে এমনকি সাংস্কৃতিক পর্যায়ে বিকশিত হওয়ার সময়। শিশু শ্রম একটি শিশুকে রোগ বালাই ও নিপিড়নের দিকে ঠেলে দেয় এতে শুধু ঐ শিশুরই ক্ষতি সাধন ঘটে না ক্ষতি হয় বিশ্ব মানব সভ্যতার। কথায় আছে- একটি প্রদীপ জ্বললে লক্ষ প্রদীপ জ্বলে ওঠে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন- আমি এই দেশে জন্মগ্রহণ করেছি বিধায় আমি শুধুমাত্র এই দেশের এবং এই সমাজেরই নই আমি গোটা পৃথিবীর একজন মানুষ। তাহলে এ থেকে বুঝা যায় যে একটি শিশু শুধুমাত্র তার নিজের পরিবারের জন্য নয় বিশ্বব্যাপী গোটা মানব সমাজ ও সভ্যতার জন্য আশির্বাদ স্বরূপ। বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে অর্থাৎ শিশু অবস্থায় ক্রমবিকাশ ও সমাজের জন্য পরিপক্ক হয়ে ওঠার সময়। শ্রম ও পেশায় উপার্জনক্ষম হয়ে ওঠার উপযুক্ত সময় নয়। কোন কোন ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ও পেটের দায়ে বাধ্য করে শিশুকে শ্রম বিনিময় করতে।
শিশুশ্রম শিশু ও মানবতাকে এমনকি নৈতিক বিকাশমান অবস্থাকে নানা ভাবে বিপর্যস্থ করে।
“সকলের জন্য মর্যাদা সম্পন্ন কাজ” আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর এই মূলনীতির অন্যতম অপরিহার্য লক্ষ্য হল শিশু শ্রম বিলোপ করা। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১৯৯৯ সালে আইএলও শিশুশ্রম নিরসন বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক কর্মসূচি গ্রহণ করে। সেই থেকে এই কর্মসূচি বিশ্বব্যাপি বিস্তৃতি লাভ করে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালে আইএলও ১২ জুনকে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে প্রথম পালন করে। বর্তমানে বাংলাদেশসহ ৮০টি দেশে বর্ণিত কর্মসূচি ও তার আওতায় দিবসটি পালিত হচ্ছে।
সারা বিশ্বে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২৫ কোটি । বিশ্বের প্রতি ছয়জন শিশুর একজন শিশুশ্রমে জড়িত। বিশ্বশিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস যাত্রার মানসিক, শারীরিক ও ভাবাবেগ বিকাশের জন্য কার্যকর। এসব শিশু পৃথিবীর নানা অংশে বিভিন্নরকম কাজ করে থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশটি কাজ করছে কৃষিখাতে। সেখানে তারা বিপজ্জনক নব রাসায়নিক দ্রব্য ও যন্ত্রপাতির সংস্পর্শে আসছে। কিছু আছে পথশিশু, যারা বেচে থাকার জন্য ঘুরছে পথে পথে। খাটছে অনানুষ্ঠানিক ফাই-ফরমাস। কেউ কেউ করে গৃহভৃত্যের কাজ। কেউ যৌনকর্মী। কেউবা কারখানার মজুর। এরা সেসব শিশু যারা সত্যিকার শৈশব, শিক্ষা বা উন্নত জীবনযাপনের যথাযথ সুযোগ পায় না।
এছাড়া প্রায়সই চলার পথে দেখা যায় যান বাহনের হেলপার হিসেবে ঝুঁকি নিয়ে টেম্পু, লেগুনার পেছনে দাঁড়িয়ে ভাড়া উত্তোলনসহ যাত্রী উঠানামার সিগনালের ক্ষেত্রে চালককে সহযোগিতা করছে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। এছাড়া হোটেলের বয়, ঝিঁয়ের কাজ, টুকাই, পশ্চিমা দেশে ও মরুভূমি এলাকায় উটের ঝকিতে ব্যবহার, চা ও পান সিগারেটের দোকানে এরকম বিভিন্ন ঝুকিপূর্ণ ও অমানবিক ক্ষেত্রে এমনকি মানবিক বিকাশমান মূল্যবান সময়ে শিশুকে বিপথগামি ও বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এতে কি শুধু একটি শিশুর ক্ষতি হচ্ছে? অবশ্যই না ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং জাতি তথা গোটা বিশ্বমানবতার ক্ষতি সাধন হয়। বিগত কয়েক মাস আগে সিলেট শহরের কুমারগাঁওস্থ তেমুখী পয়েন্টে ১২/১৩ বৎসরের সব্জি বিক্রেতা শিশু রাজনকে হত্যা করা হয়। যা শিশুশ্রম ও মানবতাকে ভুলন্ঠিত করে। এ ভাবে কতই না পৈশাচার হচ্ছে শিশু শ্রমজীবিদের উপর।
এসব শিশু কাজ করছে নিজেদের ও তাদের পরিবারের বেচেঁ থাকার জন্য। এখন যেসব দেশে শিশুশ্রম বেআইনি ঘোষিত হয়েছে, সেখানেও শিশুশ্রম আছে। নীরবতা, অবহেলা ও উদাসীনতায় গড়া এক দেয়ালের আড়ালেই পড়ে থাকে ওদের এই বিষয়টি।
স্বাধীনতা, সাম্য, নিরাপত্তা এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে নরনারীর জন্য মর্যাদাসম্পন্ন এবং উৎপাদনমূখী কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করাই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রাথমিক লক্ষ্য। ১৯১৯ সালে এই সংস্থা গঠিত হয়। সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি নিয়ে আইএলও’র পরিচালনা পরিষদ গঠিত। প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে আইএলও শিশুর নিম্নতম বয়স গ্রহণ করে এবং ১৯৩০সালে গ্রহণ করে জবরদস্তি—মূলক শ্রম কনভেশন। ১৯৯২ তে এসে এই সংস্থা শিশুশ্রম বিলোপে গ্রহণ করে ব্যাপক কর্মসূচি। ১৯৯৬ সালে স্টকহোমের সম্মেলনে ঘোষণা করে যে, কোনো শিশুর বিরুদ্ধে অপরাধ সংগঠন, তা যেখানেই হোক না কেন, সমস্ত বিশ্বের জন্য অপরাধ। ১৯৯৮ সালে মৌলিক নীতিমালা ও কর্মক্ষেত্রে জবরদস্তিমূলক শ্রমের বিলুপ্তি, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য বিলোপ এবং শিশুশ্রম উচ্ছেদ।
ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বিষয়ক আইএলও কনভেনশন নং ১৮২- এ জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম প্রতিরোধ ও নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহবানে বাংলাদেশ ২০০১ সালে অনুষ্ঠান করে।
ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমগুলো হচ্ছে:
১। সকল প্রকার দাসত্ব কিংবা দাসত্বের মতো অন্যান্য কাজ যেমন শিশুদের বিক্রয় ও পাচার, ঋণ দাসত্ব, ভূমি দাসত্ব, জবরদস্তি ও বাধ্যতামূলক শ্রম এবং সশস্ত্র সংগ্রামে ব্যবহারের জন্য শিশুদের বাধ্যতামূলক নিয়োগ;
২। পতিতাবৃত্তি, পর্নোগ্রাফি বা পর্নোগ্রাফি সদৃশ কোনো কাজের জন্য শিশুদের ব্যবহার, সংগ্রহ কিংবা সরবরাহ করা;
৩। অবৈধ কার্যকলাপ, বিশেষ করে মাদকদ্রব্য উৎপাদন ও পাচারের জন্য শিশুদের ব্যবহার;
৪। যেসব কাজ প্রকৃতিগতভাবে কোনো পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে শিশুর স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা কিংবা নৈতিকতায় ক্ষতি সাধন করে, ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ আইএলও’র সাথে এক চুক্তি স্বাক্ষর করে যাতে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক শোষণের কাল থেকে শিশুদের মুক্ত করা এবং যেসব কাজ শিশুর শিক্ষার অংগীকারকে বাধাগ্রস্ত করে কিংবা শিশুর শারীরিক মানসিক, নৈতিক, অথবা সামাজিক উন্নয়নের অন্তরায়, যেসব কাজ থেকে বাংলাদেশ শিশুদের রক্ষা করবে। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ শিশুশ্রম নিরসন বিষয়ক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করে।
শ্রম ও শ্রমসাধনা শ্রমিকের জীবন-জীবিকার উন্নতি ঘটে এমনকি শ্রমবিনিময় বা কর্মরস সামাজিক ও জাতীয় জীবনে অবদান রাখে। কিন্তু শিশু শ্রম মানবতাকে করে মর্মাহত। শিশুসভাবতই স্বাধীনতা কামী ও মুক্ত চলার অগ্রপথিক। পারিবারিক অভিভাবকের অসচেতনতা ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি শ্রমবিনিময়ে বাধ্যকরে শিশুকে। এতে শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ক্ষেত্রে চরম অন্তরায়। সুস্থ্য শিশু, সুস্থ্য সমাজ ও জাতি বিনির্মাণে পরিপক্ক ও যোগ্যতম হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার বিকল্প নেই। উন্নত দেশগুলোর যেমন ইংল্যান্ড, আমেরিকা সহ কিছু কিছু দেশে শিশুর খরচ বহনে রাষ্ট্রিয় ভাতা ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে সেরকম ব্যবস্থা নেই একটা শিশু কোন কারণে অসহায় হয়ে পড়লে তার নিজের শ্রম বিনিময় ছাড়া অন্যকোন উপায় থাকে না। তাই উন্নত জাতি গঠনে শিশুদের জন্য শ্রমবিমুখ কর্মসূচী পালন ও রাষ্ট্রকর্তৃক শিশু ভাতা প্রদান সহ অসহায় শিশুদের দায়িত্ব পালনে সরকারি ভুমিকা অত্যন্ত জরুরী। শিশু শ্রমে উৎসাহ প্রদান এবং শিশুদের কর্মে ব্যবহার কারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনী ব্যবস্থা গ্রহন করা প্রয়োজন। মানুষ মানুষের জন্য সমাজে প্রত্যেকেই মোরা পরের তরে। শান্তি স্বস্তি সবাইকে নিয়ে শিশু ছিল শিশু আছে শিশু থাকবে ঘুর্নায়মান বংশগতি মানব ধারায়।
প্রতিটি শিশু যেন তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় এবং অকালে শিশুশ্রম দিতে না হয়। আজকের শিশু আগামী দিনের সমাজ ও জাতিবিনির্মানের কর্ণধার।

লেখক: কলামিষ্ট, প্রাক্তন শিক্ষক ।

Share





Related News

Comments are Closed