Main Menu

এক মিনিটেই শেষ ট্রেনের টিকিট, নতুন এজেন্সি নিয়োগের উদ্যোগ

বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: অনলাইনে টিকিট ছাড়ার এক মিনিটের মধ্যেই ট্রেনের সব আসন শেষ হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ যাত্রীরা টিকিট না পেলেও কালোবাজারে মিলছে টিকিট-এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর মধ্যে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা বট ব্যবহার করে টিকিট ব্লক করা, অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম ও যাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাঝুঁকির তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ রেলওয়ের আইটি অডিটে। এসব অভিযোগের মধ্যে অনলাইন টিকিট ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে। আগামী মাসে টিকিটিং সিস্টেম পরিচালনার জন্য নতুন এজেন্সি নিয়োগে দরপত্র আহ্বান করা হবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে সব প্রশাসনিক বিষয় নিজেদের আওতায় নিয়েছি। আগামী মাসে টিকেটিং সিস্টেম পরিচালনার জন্য নতুন এজেন্সি নিয়োগ দিতে দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছি।’

রেলওয়ের সমন্বিত টিকিটিং ব্যবস্থা (বিআরআইটিএস) নিয়ে ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত পরিচালিত আইটি অডিটে একাধিক অনিয়ম ও নিরাপত্তাঝুঁকির তথ্য উঠে এসেছে। অডিটে বলা হয়েছে, সাধারণ যাত্রীদের জন্য অনলাইনে টিকিট প্রকাশের কয়েক দিন আগেই অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করে টিকিট ব্লক করার সুযোগ রয়েছে। টিকিটিং সিস্টেমের ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান সহজের প্রতিনিধি ও রেলওয়ের বুকিং সহকারীরা এ সুযোগ নিতে পারেন বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

অডিট প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সহজের কর্মীদের পরিচালনায় প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে টিকিট ব্লক করে কালোবাজারির সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে গত ১৬ আগস্ট বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালককে পাঠানো চিঠিতে আইটি অডিট দলের উত্থাপিত ২২টি অডিট মেমো গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

বট দিয়ে টিকিট ব্লকের অভিযোগ

অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরুর পরপরই সব টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ার পেছনে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা বট ব্যবহারের অভিযোগও সামনে এসেছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানের নথিতে এ ধরনের কার্যক্রমের তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে ঢাকা পোস্ট।

নথি অনুযায়ী, ‘bookmyrailbd.com’ নামের একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ব্যবহার করে রেলের ই-টিকিটিং ব্যবস্থা থেকে টিকিট বিক্রি শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই বিপুলসংখ্যক টিকিট ব্লক করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে এসব টিকিট অননুমোদিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সাধারণ যাত্রীদের কাছে বাড়তি দামে বিক্রি করা হতো বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের কার্যক্রমের ফলে সাধারণ যাত্রীরা ন্যায্যমূল্যে টিকিট পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং ই-টিকিটিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে নথিতে বলা হয়েছে।

এ ঘটনায় টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গত ১১ অক্টোবর স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে তিন কার্যদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি পাঠানোর প্রস্তাবের কথা উল্লেখ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

যাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্য চুরির ঝুঁকি

বিআরআইটিএসের মূল ডেটাবেইস আমাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) সিঙ্গাপুর অঞ্চলে ভার্চুয়াল প্রাইভেট ক্লাউডে সংরক্ষিত রয়েছে। এ ডেটাবেইসের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অডিট দল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেটাবেইস হ্যাক হলে যাত্রীদের নাম, মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা, ভ্রমণের ইতিহাস এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য চুরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এসব তথ্য ব্যবহার করে প্রতারণা করা হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

রেলওয়ের ই-টিকিটিং অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির কারিগরি শর্তেও রয়েছে। ফলে বট ব্যবহার করে টিকিট ব্লক করার অভিযোগের পাশাপাশি ব্যবস্থাটির নিরাপত্তা ও তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা নিয়েও প্রশ্ন

টিকিট ব্যবস্থাপনার অনিয়মের পাশাপাশি অনলাইন টিকিট বিক্রির আয় থেকে সরকারি কোষাগারে কম অর্থ জমা দেওয়ার বিষয়টিও অডিটে উঠে এসেছে। এ ছাড়া সিস্টেম দীর্ঘ সময় অকার্যকর থাকায় সহজ লিমিটেডের কাছ থেকে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অডিটে উত্থাপিত এসব পর্যবেক্ষণ রেলের টিকিট বিক্রির আয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

পাঁচ বছরেও টিকিট পাননি নিয়মিত যাত্রী

অনলাইনে টিকিট না পাওয়ার ভোগান্তি দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ঢাকা থেকে সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুটে যাত্রীরা প্রায়ই টিকিটসংকটে পড়েন। অনেকে বিকল্প পরিবহনে যেতে বাধ্য হন। আবার কেউ কেউ অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে কালোবাজার থেকে টিকিট সংগ্রহ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিয়মিত যাত্রীদের অভিযোগ, দূরপাল্লার যাত্রী হওয়ায় প্রতি বছর ঈদে তাঁকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। গত পাঁচ বছরে দু-একবার ছাড়া বেশির ভাগ সময় রেলের ওয়েবসাইটে টিকিট পান না তারা। পরে বাধ্য হয়ে কালোবাজার থেকে চড়া দামে টিকিট কিনতে হয়েছে।

এক মিনিটে শেষ দুই ট্রেনের টিকিট!

গত ৭ অক্টোবর চলচ্চিত্র নির্মাতা ও নাট্যকার আশফাক নিপুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রেনের টিকিট না পাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

তিনি জানান, পূজার ছুটিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজার যাওয়ার জন্য সেদিন সকাল ৮টায় ট্রেনের টিকিট ছাড়ার অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁর মামার শারীরিক কারণে বাসে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ সম্ভব না হওয়ায় তাঁরা ট্রেনে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।

আশফাক নিপুণ লেখেন, সকাল ৭টা ৪৫ মিনিট থেকেই তিনি টিকিট কাটার প্রস্তুতি নিয়ে বসেছিলেন। সকাল ৮টায় ‘সার্চ ট্রেন’ চাপার পর আসন বিন্যাস দেখতে পেলেও মাত্র এক মিনিটের মধ্যে দুটি ট্রেনের সব টিকিট শেষ হয়ে যায়।

তাঁর প্রশ্ন, একটি টিকিট নির্বাচন, ওটিপি, পেমেন্ট ও নিশ্চিতকরণ সম্পন্ন করতে যেখানে তাঁর অভিজ্ঞতায় সাড়ে ছয় থেকে সাত মিনিট লাগে, সেখানে মাত্র এক মিনিটে দুটি ট্রেনের সব টিকিট কীভাবে বিক্রি হয়ে গেল?

তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, দীর্ঘ ছুটিতে টিকিট কাটতে গিয়ে বারবার একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে কেন এবং টিকিট সিন্ডিকেটের অভিযোগের পেছনে কারা রয়েছে। সরকার ও মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তন হলেও টিকিট ব্যবস্থাপনায় প্রভাবশালী চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ হচ্ছে না- এমন ধারণা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নতুন এজেন্সি নিয়োগে কতটা কমবে ভোগান্তি?

রেলওয়ের অডিটে অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের ব্যবহার, টিকিট ব্লক করার সুযোগ, যাত্রীদের তথ্যের নিরাপত্তা, সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা এবং জরিমানা আদায়ে অনিয়মের মতো একাধিক বিষয় উঠে এসেছে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানের নথিতে বট ব্যবহার করে টিকিট ব্লক করার অভিযোগও রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে টিকিটিং সিস্টেম পরিচালনার জন্য নতুন এজেন্সি নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। আগামী মাসে দরপত্র আহ্বানের মধ্য দিয়ে এ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা।

তবে শুধু নতুন এজেন্সি নিয়োগই যথেষ্ট হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। টিকিট প্রকাশের আগে অননুমোদিতভাবে আসন ব্লক করার সুযোগ বন্ধ করা, অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, যাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং টিকিট বিক্রির আয় ও চুক্তির শর্ত যথাযথভাবে তদারকি করা জরুরি।

নতুন ব্যবস্থায় এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পরিবর্তন আসে কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে সাধারণ যাত্রীদের টিকিটপ্রাপ্তি সহজ হওয়া এবং দীর্ঘদিনের কালোবাজারির অভিযোগ কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে।

Share





Related News

Comments are Closed