পাকিস্তানে শান্তি আলোচনার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া সতর্কবার্তা ইরানের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: টানা ৩৮ দিনের সংঘাত শেষে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চলছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। অস্থায়ী এই যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী রূপ দিতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনায় বসতে যাচ্ছে দুই পক্ষ। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এ বৈঠক।
তবে, শান্তি আলোচনায় বসার আগেই কড়া এক সতর্কবার্তা দিয়ে রেখেছে ইরান। দেশটির প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরিফ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, ইসলামাবাদে চলমান আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরায়েলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে কোনও চুক্তি হবে না।
শনিবার (১১ এপ্রিল) এক বার্তায় এই হুঁশিয়ারি দেন তিনি। খবর সিনহুয়ার।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রেজা আরিফ লিখেছেন, ‘যদি আমাদের এমন প্রতিনিধিদের মুখোমুখি হতে হয় যারা ‘ইসরায়েল প্রথম’ নীতিতে বিশ্বাসী, তবে কোনও চুক্তি হবে না। সেক্ষেত্রে আমরা অনিবার্যভাবে আগের চেয়ে আরও জোরালোভাবে আমাদের প্রতিরক্ষা বজায় রাখব এবং বিশ্বকে আরও চড়া মূল্য দিতে হবে।’
মধ্যপ্রাচ্যে শত্রুতা নিরসনের লক্ষ্যে শান্তি আলোচনার জন্য বর্তমানে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থান করছে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে দুটি প্রতিনিধি দল।
এই বৈঠককে সামনে রেখে এরই মধ্যে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুলের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির। ওই ফোনালাপে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আরাঘচি বলেছেন, ‘সম্পূর্ণ অবিশ্বাস’ নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিচ্ছে ইরান। অতীতে বারবার কূটনীতিতে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাই নিজেদের জনগণের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে লড়াই করবে ইরান।
এর আগে, একই কথা বলেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফও। শুক্রবার স্থানীয় সময় রাতে (১০ এপ্রিল) ইসলামাবাদে পৌঁছে এক বিবৃতিতে ইরানের প্রতিনিধিদলের প্রধান গালিবাফ বলেন, তেহরানের সদিচ্ছা আছে, কিন্তু ওয়াশিংটনের ওপর আমাদের কোনো বিশ্বাস নেই।
এসময় তিনি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অতীতের বিশ্বাসঘাতকতার অভিজ্ঞতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। গালিবাফ বলেন, ইরানের সদিচ্ছা থাকার পরও এক বছরের কম সময়ের মধ্যে আলোচনার মাঝপথে দুইবার তারা আমাদের ওপর হামলা করেছে এবং অসংখ্য যুদ্ধাপরাধ করেছে।
ইরানের প্রতিনিধিদলের প্রধান আলোচক অবশ্য এও বলেছেন, যদি আমেরিকান পক্ষ একটি প্রকৃত চুক্তির জন্য প্রস্তুত থাকে এবং ইরানি জাতির অধিকার মেনে নিতে রাজি হয়, তবে তারা ইরানের পক্ষ থেকেও একটি চুক্তির জন্য প্রস্তুতি দেখতে পাবে।
প্রসঙ্গত, ইরানের পরমাণু প্রকল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে সংলাপ চলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় সেই সংলাপ।
পরের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েলও।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ যৌথ হামলার প্রথম ধাক্কাতেই প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য। ৩৮ দিন ধরে চলা এই যুদ্ধে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি, সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপৌরসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে হারায় ইরান। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ ও ধ্বংস হয় দেশটির বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। সেইসঙ্গে প্রাণ হারায় ইরানের ২ হাজারের বেশি মানুষ।
যুদ্ধ চলাকালীনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার এক বক্তব্যে জানান, এই যুদ্ধ শুরুর জন্য তাকে অব্যাহতভাবে চাপ দিয়েছিল ইসরায়েল ও সৌদি আরব।
এদিকে, ৩৮ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে শক্ত জবাব দেয় ইরানও। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের ৬ দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্তর আরব আমিরাত, ওমানে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় দেশটি। ইরানের লাগাতার হামলার মুখে করুণভাবে ভেঙে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও। এ অবস্থায় আবার ইরানের পক্ষে যোগ দেয় লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতি বাহিনী; যা ইরানের শক্তি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয় যুদ্ধে। এছাড়া, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ইরানের হামলায় ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়ে যায় ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্ররা। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ধস নামে মার্কিন তেল বাণিজ্যেও।
এ অবস্থায় ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর জন্য শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের দ্বারস্ত হয় যুক্তরাষ্ট্র। গত ৭ এপ্রিল কার্যকর হয় ১৫ দিনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি। কিন্তু, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন ও বিশ্বাসঘাতকতার কলঙ্ক এবারও মুছতে ব্যর্থ যুক্তরাষ্ট্র। তেহরান-ওয়াশিংটনের সমঝোতা হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই লেবাননে নারকীয় এক হত্যাযজ্ঞ চালায় ইসরায়েল। মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে ৫০টি বিমান নিয়ে একশোরও বেশি গোলাবর্ষণ করে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। অল্প সময়ের এই হামলায় প্রাণ হারান তিনশো জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে এই হামলার দায় এড়াতে চাইলেও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি করে বসেন, লেবাননে চালানো ভয়াবহ ওই হামলা তারা করেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বোঝাপড়া করেই।
ফলে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অতীত ইতিহাস মাথায় রেখে বেশ সতর্ক অবস্থানেই আছে ইরান। এমনকি, আবারও যুদ্ধের আশঙ্কায় সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে দেশটি।
Related News
সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে রেড অ্যালার্ট, ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা
Manual3 Ad Code আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পবিত্র নগরী মক্কার পর সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে সর্বোচ্চ সতর্কতাRead More
বিশ্বে ২ কোটি শিশু অনলাইনে যৌন নির্যাতনের শিকার : ইউনিসেফ
Manual4 Ad Code আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বিশ্বের ২১টি দেশে এক বছরে ১২ থেকে ১৭ বছরRead More



Comments are Closed