Main Menu

সাপের কামড়: অপচিকিৎসা ও অজ্ঞতা দূর করতে হবে

মাসুদ পারভেজ: বিষধর রাসেলস ভাইপারের বসবাস বরেন্দ্র অঞ্চলে হলেও এখন প্রায় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সেকারণে এ সাপ নিয়ে সচেতন হতে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নির্দেশনা দিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।

নির্দেশনামূলক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাসেলস ভাইপারের উপস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে মানুষের সঙ্গে এ সাপের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা কম। এ সাপ সাধারণত নিচু ভূমির ঘাসবন, ঝোপ-জঙ্গল, উন্মুক্ত বন, কৃষি এলাকায় থাকে। মানুষের বসতি এড়িয়ে চলে। মেটে রঙের হওয়ায় এ সাপ মাটির সঙ্গে সহজে মিশে থাকতে পারে। মানুষ খেয়াল না করে কাছাকাছি গেলে, সাপটি বিপদ দেখে, ভয়ে পেয়ে আক্রমণ করে। রাসেলস ভাইপার দক্ষ সাঁতারু সাপ। তাই এটি নদীর স্রোত ও বন্যার পানিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এ জন্য সবাইকে সাবধানতা অবলম্বন করার জন্য অনুরোধ করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।

সাপের কামড়ে বিশ্বে প্রতি বছর মারা যায় প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে এ সংখ্যা ছয় হাজার। কিন্তু প্রতি বছর দেশে সাত লাখের মত মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হয়। সাপে কাটার ঘটনা গ্রামাঞ্চলে এবং কৃষি সংশ্লিষ্ট এলাকায় বেশি ঘটে থাকে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাজশাহী এবং ময়মনসিংহ এলাকায় সাপের কামড় এবং তা থেকে মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটে। বাংলাদেশে প্রায় ৯৪ প্রজাতির সাপের মধ্যে ৬টি প্রজাতির সাপের কামড়ে মানুষ বেশি মারা যায়। আশঙ্কার বিষয় হল- এর মধ্যে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় মাত্র ৩ শতাংশ মানুষ।

বাংলাদেশ টক্সিকোলজি সোসাইটির প্রধান অধ্যাপক এমএ ফায়েজ বলেন, বাংলাদেশে যত মানুষ সাপের দংশনে মারা যায়, তারচেয়ে চারগুণ বেশি মানুষের নানা রকম অঙ্গহানি ঘটে, শারীরিকভাবে পঙ্গু হয়ে যায় কিংবা দীর্ঘদিন মানসিক ট্রমায় ভোগে।

বর্ষকালে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে আগাছা জন্মে মাটি ঢেকে যায়; রান্নাঘরের মেঝে বা বাড়ির আশেপাশের মাটিতে জ্বালানির কাঠ বা আবর্জনা স্তুপাকারে জমা করে রাখলে, পুরোনো বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, গাছের কোটর ও ইঁদুরের গর্ত পেলে সাপ সহজে এসব স্থানে বসতি স্থাপন করে। এরা ভোরবেলা, সন্ধ্যা ও রাতে খাবার শিকারে কিংবা মিলনের জন্য বাইরে যায়। দিনের বেলা সাপ বাইরে আসে না বললেই চলে। রাতে কিংবা দিনে সাপের চলাচলে কিংবা বিশ্রামে বাধা সৃষ্টি করলে তবেই সাপ কামুড় দিতে পারে। মনে রাখতে হবে, মানুষ যেমন সাপকে দেখে ভয় পায় তেমনি সাপও মানুষকে দেখে ভয়ে থাকে; মানুষ থেকে আড়ালে থাকতে চায়। সাপ সাধারণত নিরুপায় হয়ে জীবন রক্ষার্থে কামড়ায়।

শরীরে বিষধর সাপে কাটার বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে নিকটস্থ হাসপাতালে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত। বিষধর সাপের কামড়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর কারণ সচেতনতার অভাব; ওঝা বা বেদের মাধ্যমে অবৈজ্ঞানিক উপায়ে চিকিৎসা করানো এবং রোগীকে হাসপাতালে আনতে বিলম্ব করা। জেনে রাখা ভালো, বেশির ভাগ সাপই নির্বিষ, এমনকি বিষধর সাপের পক্ষেও দংশনকালে সব সময় প্রচুর পরিমাণ বিষ ঢেলে দেওয়া সম্ভব হয় না। এ জন্য আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাহস দেওয়া প্রয়োজন। প্রাথমিক চিকিৎসার পর দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাঁটতে না দিয়ে কাঁধে, খাটিয়ায় বা কোনো যানবাহনের সাহায্যে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভেনম রিসার্চ সেন্টারের প্রধান গবেষক ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষ বলেন, সাপে কাটলে একজন মানুষের শরীরে তিন ধরনের প্রভাব পড়ে। সেগুলো হচ্ছে হেমোটক্সিন বা রক্ত দূষণ, মায়োটক্সিন বা মাংসপেশি অকার্যকর এবং নিউরোটক্সিন বা মস্তিষ্কে অকার্যকর। বাংলাদেশে বেশিরভাগ মানুষ সাপে কাটার পর ওঝার কাছে যায়। যথাযথ প্রতিষেধকের পরিবর্তে ওঝা ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নেয়ায় তৈরি হয় মৃত্যুঝুঁকি।

সাপে কাটার জায়গা কিছুতেই কাটাছেঁড়া করা উচিত নয়। কেবল ভেজা কাপড় দিয়ে কিংবা জীবাণুনাশক মলম দিয়ে ক্ষতস্থান মুছে দিতে হবে। দংশন করা স্থান থেকে ওপরের দিকে একটি লম্বা কাঠ এবং গামছা বা কাপড় দিয়ে এমনভাবে বাঁধন দিতে হবে, যেন একটি আঙুল একটু চেষ্টায় বাঁধনের নিচ দিয়ে যেতে পারে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সামন্ত লাল সেন বলেন, দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিষের প্রতিষেধক বা অ্যান্টিভেনম আছে। সব জায়গায় হাসপাতালগুলোয় অ্যান্টিভেনম রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসেলস ভাইপারের যে অ্যান্টিভেনম সেটাসহ অন্যান্য অ্যান্টিভেনম আমাদের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত মজুদ আছে। তিনি বলেন, সাপে দংশনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রোগীকে দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া। অনতিবিলম্বে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে এ ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলা সম্ভব।

ডা. সামন্ত লাল সেন এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির জন্য প্রচার-প্রচারণার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, সাপে দংশনের বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা খুবই জরুরি। রোগীকে হাসপাতালে আনতে যাতে দেরি না হয় সে বিষয়ে আমাদের সবাইকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো অন্যান্য দপ্তর, সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে সাপে কামড় থেকে বাঁচাতে বিভিন্ন রকম প্রচার-প্রচারণামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতায় আট কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছরের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলমান। এতে সম্পৃক্ত আছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগ, মেডিসিন টক্সিকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর অ্যাডভান্স মেন্টর ট্রপিক্যাল মেডিসিন এবং জার্মানির গ্যাটে ইউনিভার্সিটি।

সাপে কামড়ের ঘটনা মে থেকে অক্টোবর মাসে বেশি দেখা যায়। মূলত অসচেতনাই সাপে কাটার জন্য দায়ী। সাধারণত বর্ষায় সাপ আতঙ্ক এবং সাপের উপদ্রব দুটোই বেড়ে যায়। এ সময়ে বাড়ির আশেপাশে ঝোঁপঝাড় পরিস্কার রাখতে হবে; মাটির ঘরে ইঁদুরের গর্ত বন্ধ করতে হবে; কার্বলিক এসিড ঘরের কোনে রেখে দিতে হবে; ঘরে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে হবে; মেঝেতে ঘুমানো বন্ধ করতে হবে। মশারি টানিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস করতে হবে; শয়নকক্ষের সাথে খাদ্যসামগ্রী, যেমন- ধান-চাল কিংবা হাঁস-মুরগি, কবুতর ইত্যাদি না রাখাই ভালো। মাছ ধরার সময় ‘চাই’ কিংবা ‘জাল’র মধ্যে হাত দেওয়ার আগে সাপ আছে কি-না তা দেখে নিন। স্থলভাগের সাপ বেশিরভাগ সময় কামড় দেয় পায়ে। কাজেই সাপ থাকতে পারে এমন জায়গায়, যেমন- ঘাসের মধ্যে কিংবা ঝোপ-ঝাড়ের ভেতর হাঁটার সময় বিশেষ সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। কৃষিক্ষেতে কাজ করার সময় পায়ে গামবুট পরতে হবে এবং অন্ধকারে হাঁটার সময় টর্চলাইট, লাঠি ইত্যাদি সঙ্গে রাখতে হবে। কখনো সাপ সামনে পড়ে গেলে ধীর-স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা উচিত। সাপ প্ররোচনা ছাড়া অনর্থক দংশন করে না। অপচিকিৎসা ও অজ্ঞতা দূর করে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারলেই সাপের কাপড় থেকে আমরা সুরক্ষিত থাকব। -পিআইডি ফিচার

Share





Related News

Comments are Closed