Main Menu

আদর্শ মুসলিম পরিবারের ১০ বৈশিষ্ট্য

ধর্ম ডেস্ক: পরিবার মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। পরিবার থেকেই মানুষের গতি-প্রকৃতি নির্ধারিত হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ঘর ও পরিবারকে তাঁর অন্যতম দান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের ঘরকে করেছেন তোমাদের আবাসস্থল।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৪০)

ঘর ও পরিবারকে মানুষের প্রকৃত আবাস ও আশ্রয় হিসেবে গড়ে তুলতে ইসলাম বহুমুখী নির্দেশনা দিয়েছে। যার মাধ্যমে একটি আদর্শ পরিবার গঠন করা সম্ভব। কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত আদর্শ মুসলিম পরিবারের ১০টি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো।

আদর্শ স্ত্রী নির্বাচন

আদর্শ মুসলিম পরিবার গঠনের প্রথম শর্ত আদর্শ স্ত্রী নির্বাচন করা। স্ত্রী নির্বাচনে কোরআনের নির্দেশনা হলো—‘তোমাদের মধ্যে যারা ‘আইয়িম’ (স্বামীহীন নারী) তাদের বিয়ে করো এবং তোমাদের দাস-দাসীর মধ্যে যারা সৎ তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাব দূর করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩২)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা চার গুণ দেখে মেয়েদের বিয়ে করো : তার সম্পদের জন্য, তার বংশ পরিচয়ের জন্য, তার সৌন্দর্যের জন্য ও তার ধার্মিকতার জন্য। অতঃপর তুমি ধার্মিকতাকে অগ্রাধিকার দাও। নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৯০)

দ্বিনের চর্চা থাকা

আদর্শ মুসলিম পরিবারে দ্বিনের চর্চা থাকবে। সেখানে ধর্মীয় জ্ঞান ও অনুশাসন, আল্লাহর বিধি-বিধানের প্রতিপালন, কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধের চর্চা থাকবে। তাদের জীবনযাপনে আল্লাহর স্মরণ জাগ্রত হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আমি মুসা ও তার ভাইয়ের প্রতি প্রত্যাদেশ দিলাম—মিসরে তোমার সম্প্রদায়ের জন্য ঘর নির্মাণ করো। তোমাদের ঘরগুলোকে ‘ইবাদতখানা’ করো, তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং মুমিনদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ৮৭)

পরিবারে দ্বিনচর্চা উৎসাহিত করতে পরিবারপ্রধান ও অভিভাবকরা নিজের দৃষ্টান্তরূপে উপস্থাপন করবে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন ঘরে ফিরতেন তাঁর হাতে মিসওয়াক থাকত।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৩)

ধর্মীয় শিক্ষা নিশ্চিত করা

আদর্শ মুসলিম পরিবার তাদের সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা প্রদান করবে। কোনো কারণে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ানো সম্ভব না হলে, অন্তত দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় (ফরজ) ধর্মীয় জ্ঞান যেন শিশুরা পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। কেননা প্রয়োজনীয় ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা মুসলমানের জন্য ফরজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘(ইসলামী) জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৪)ইসলামী পঠনসামগ্রী থাকা আদর্শ ইসলামী পরিবার প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামী শিক্ষার ওপর নির্ভর করবে না; বরং পরিবারে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করবে। যাতে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও বিধি-বিধানের পাশাপাশি কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা গ্রন্থ, ইসলামী সাহিত্য ও ইতিহাস-ঐতিহ্যবিষয়ক বই থাকবে। শিশুদের ইসলামী সাহিত্য পাঠে অভ্যস্ত করে তুলবে। বর্ণিত আছে, ‘জ্ঞান মুমিনের হারানো সম্পদ। যখন সে তা পায় সংরক্ষণ করে এবং অপর হারানো বস্তুর অনুসন্ধান করে।’ (শায়খ আলবানি এই বর্ণনার সনদকে সহিহ বলেছেন। সুতরাং পরিবারে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার একটি আবহ সৃষ্টি করতে হবে।

পারস্পরিক জবাবদিহি

কোনো পরিবারকে আদর্শ পরিবার হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তাতে অবশ্যই ‘ভালো কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজে নিষেধে’র চর্চা থাকতে হবে। এই ক্ষেত্রে ছোটরা বড়দের কাছে জবাবদিহি করবে আর বড়রা ছোটদের সামনে নিজেদের আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করবে। তাদের সামনে অপরাধ করতে লজ্জাবোধ করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন।’ (সুরা : আশ-শুয়ারা, আয়াত : ২১৪)

এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর পরিবারের ৩০ জন সদস্যকে একত্র করে সতর্ক করে বলেন, ‘তোমরা নিজেদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির)। সুতরাং মুসলিম পরিবার পারস্পরিক পরামর্শ, সহযোগিতা, জবাবদিহি ও সতর্কীকরণের মাধ্যমে নিজেদের সুপথে পরিচালিত করবে।

পাপ ও পাপ উপকরণমুক্ত হওয়া

পাপ ও পাপের উপকরণ থেকে মুক্ত থাকবে আদর্শ মুসলিম পরিবার। কেননা পাপের উপকরণ পাপ কাজে উৎসাহিত করে। আর পাপ পারিবারিক শৃঙ্খলা ও শান্তি নষ্ট করে। এমনকি কোনো ভালো উপকরণের মন্দ ব্যবহার বেশি হলেও তা পরিবার থেকে দূরে রাখবে। আর যে উপকরণের মন্দ ব্যবহারই বেশি তা অবশ্যই পরিহার করবে। ভালো ও মন্দ জিনিসের ব্যবহার বিষয়ে নিম্নোক্ত হাদিস থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত আতর বিক্রেতা ও কামারের হাপরের মতো। আতর বিক্রেতার কাছ থেকে হয়তো তুমি আতর কিনবে বা তার সুঘ্রাণ পাবে। আর কামারের হাপর তোমার শরীর বা কাপড় পুড়িয়ে দেবে অথবা তুমি তার দুর্গন্ধ পাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২১০১)। আবদুর রহমান হাসান জানকা বলেন, ‘ব্যক্তি ও পরিবারের মধ্যে বিচ্ছেদ ও দ্রোহের আগুন নেভাতে শিকড় থেকে চরিত্র সংশোধন করতে হবে। কেননা পাপে মত্ত ব্যক্তিরাই পরিবার ও আপনজন থেকে দূরে সরে যেতে চায়। পাপ তার ভেতর অস্থিরতা দূর করে।’ (আল আখলাকুল ইসলামিয়া ও আসাসুহা : ১/৩৮)

সময়ের শৃঙ্খলা

সময়ের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা আদর্শ পরিবারের জন্য অপরিহার্য। বিশেষত পরিবারের নামাজ, ইবাদত ও দ্বিনি জ্ঞানচর্চায় সময়ের শৃঙ্খলা থাকা আবশ্যক। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমরা নামাজের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষত মধ্যবর্তী নামাজের এবং আল্লাহর উদ্দেশে তোমরা বিনীত হয়ে দাঁড়াও।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৩৮)

এ ছাড়া শিশুদের পড়ালেখা, খাওয়া-দাওয়া, খেলাধুলা ও ঘুম ইত্যাদি যেন সময়মতো হয় তাও লক্ষ রাখতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন কোনো বান্দা সামনে অগ্রসর হতে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, সে জীবন (সময়) কোথায় ব্যয় করেছে, জ্ঞান কী কাজে লাগিয়েছে, সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে ও কোথায় ব্যয় করেছে এবং শরীর কোথায় উন্মুক্ত করেছে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৭)

গোপনীয়তা রক্ষা

পারিবারিক গোপনীয়তা রক্ষা করা আদর্শ মুসলিম পরিবারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এটা শুধু দাম্পত্য জীবনের গোপনীয়তা নয়; বরং অন্যান্য বিষয়েও গোপনীয়তা রক্ষা করা আবশ্যক। পারিবারিক কলহ-বিবাদ মীমাংসার পদ্ধতি তুলে ধরে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তাদের উভয়ের মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করলে তোমরা তার (স্বামী) পরিবার থেকে একজন ও তার (স্ত্রী) পরিবার থেকে একজন সালিস নিযুক্ত করবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৫)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পারিবারিক জীবনে কোনো সংকট দেখা দিলে তা নিজেদের মধ্যে গোপন রাখবে এবং নিজেরাই তার সমাধান করবে। আর দাম্পত্য জীবনের গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘অবস্থানের দিক থেকে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্ট মানুষ হলো যে স্বামী তার স্ত্রীর কাছে যায় এবং যে স্ত্রী তার স্বামীর কাছে যায়, অতঃপর সেই গোপনীয়তা প্রকাশ করে দেয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪৩৭)

পরস্পরকে সহযোগিতা

সাংসারিক কাজে পরিবারের সদস্যরা পরস্পরকে সহযোগিতা করবে। কারো ওপর নির্ভর করে থাকবে না। শিশুদেরও ছোট থেকে স্বনির্ভর হতে শেখাবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) পারিবারিক কাজে স্ত্রীদের সহযোগিতা করতেন। পারিবারিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা আল্লাহ ভালোবাসেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ যখন কোনো পরিবারের কল্যাণ চান, তখন তাতে মমতা ও ভালোবাসা দান করেন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৫৯৩)

পর্দা ও শালীনতা

ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে শালীনভাবে চলার নির্দেশ দিয়েছে। তবে নারীর প্রতি যেহেতু পুরুষের আকর্ষণ অনেক বেশি প্রবল তাই নারীকে নারীসুলভ সৌন্দর্য প্রদর্শন না করার নির্দেশ দিয়েছে। অশ্লীল পোশাক ও চালচলন পরিহার করতে বলেছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা ঘরে অবস্থান করো এবং জাহেলি (বর্বর) যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করো না।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৩)

শুধু বাইরে নয়; বরং ঘরেও নারী-পুরুষ উভয়কে শালীনভাবে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা সুরা নুরের ৩১ ও ৫৮-৫৯ নম্বর আয়াতে বুঝমান শিশুর সামনে শালীন পোশাক পরিধানের নির্দেশ দিয়েছে। শালীনতা নষ্ট হয় এমন সময় (ফজরের আগে, দুপুরে বিশ্রামের সময় ও এশার পর) ঘরে প্রবেশের আগে তাদের অনুমতি নিতে বলা হয়েছে।

0Shares





Comments are Closed