আজ পলাশী দিবস
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক : ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে জুন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যার পর (৩রা’ জুলাই ১৭৫৭ খ্রিঃ) মীরজাফর সিদ্ধান্ত দিলেন লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যা যোহরা, সিরাজ মাতা আমেনা বেগম, খালা ঘষেটি বেগম এবং সিরাজের নানী সরফুন্নেসা সহ আরো অনেককে নির্বাসনে পাঠানো হবে ঢাকার জিনজিরায়। ১৭৫৮ খ্রিষ্টাব্দে নবাব পরিবারের এই সদস্যদের ঠাসাঠাসি করে তোলা হলো একখানা সাধারণ নৌকায় এবং পাঠানো হলো ঢাকার জিনজিরায়।
পলাশী বিপর্যয়ের পর সিরাজ একাকী পলায়নের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু লুৎফুন্নেসা তাঁকে সঙ্গী করার জন্য আকুল আবেদন জানান। সিরাজ তাঁর বিশ্বস্ত স্ত্রী লুৎফুন্নেসা, তাঁদের একমাত্র কন্যা যোহরা এবং একজন অনুগত খোজা সহ ১৭৫৭ সালের ২৪ জুন গভীর রাতে নিভৃতে মুশির্দাবাদ শহর ত্যাগ করেন। হতভাগ্য সিরাজ পলায়ন করতে গিয়ে মীর জাফরের ভ্রাতা মীর দাউদের হাতে ধরা পড়েন রাজমহলে। মীর জাফরের জামাতা মীর কাসিম সেখানে গিয়ে তাঁকে ধরে নিয়ে আসেন মুশির্দাবাদে।
নবাব সিরাজউদ্দৌলা গ্রেপ্তার হওয়ার পর মীর কাসিম লুকানো সোনা-দানার সন্ধান চেয়ে লুৎফুন্নেসার ওপর অমানবিক অত্যাচার করেন। এদিকে মীর জাফরের পুত্র মীরনের আদেশে মুহম্মদী বেগ ১৭৫৭ সালের ৩’রা জুলাই সিরাজকে নিমর্মভাবে হত্যা করেন এবং মীর জাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে তাঁর মৃতদেহ হাতির পিঠে করে সারা মুর্শিদাবাদ নগরে অত্যন্ত অপমানজনক অবস্থায় প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন।
নবাবের স্ত্রী, মা এবং অনেক আত্মীয়স্বজন তখন বন্দী ছিলেন। তাঁদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তারা আলীবর্দী খাঁর বিখ্যাত আম খেতে চান কিনা (মালদহের বিখ্যাত ফজলী আম)। অশ্রুসজল নয়নে ক্ষুধার্ত অবস্থায় তারা ইঙ্গিতে সম্মত দিয়েছিলেন। তারপর করুণার জীবন্ত ছবি ইংরেজ সরকারের আদেশ অনুযায়ী অর্ধভর্তি আমের বস্তা পৌঁছে দেয়া হয়েছিল তাদের কাছে। নবাব পরিবারের সব মহিলার পক্ষ থেকে একজন বস্তার মুখ খুলতেই দেখতে পেলেন ভেতরে আম নেই বা অন্য কোনো খাদ্যদ্রব্যও নেই। আছে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার বীভৎস কাঁচা কাটা মাথা। নবাব যেনো তাঁর গর্ভধারিণী মায়ের সাথে শেষ দেখা করতে এসেছেন। নবাবের হতভাগী মা’ প্রিয় পুত্রের মুখের দিকে তাকাতেই অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
স্বামীর শাহাদতের পর সিরাজের তরুণী বিধবা স্ত্রী লুৎফুন্নেসা মীর জাফর ও মীরণের বিবাহ প্রস্তাব প্রত্যাখান করে সারাজীবন অর্থাৎ দীর্ঘদিন স্বামীর কবরে পবিত্র কুরআন শরীফ পাঠ করে সময় অতিবাহিত করেছেন। আসলে নবাব সিরাজের চরিত্রের ওপর লুৎফা বেগমের বিরাট প্রভাব পড়েছিল। নবাবের পতনের পর লুৎফুন্নেসা সীমাহীন কষ্টের মধ্যে দিন অতিবাহিত করেন। লুৎফুন্নেসা খোশ বাগে সিরাজের কবরের পাশে একখানি কুড়ে ঘর তৈরী করে বাকী জীবনটা সেখানেই কাটিয়ে দেন।
তিনি সূদীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে এভাবে স্বামীর সেবা করে ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দের ২৩ শে নভেম্বর পরলোক গমন করেন এবং মূর্শিদাবাদের খোশবাগে সিরাজের পাশেই সমাধিস্থত হন। কিন্তু পলাশী কখনো তাঁকে পাশ কাটিয়েও যেতে পারেনি, তিনি এক নারী নাম তাঁর বেগম লুৎফুন্নেসা। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সহধর্মিনী। পলাশী বিপ্লব ২০২১ সালে ২৬৪ বছর অতিক্রম করছে। কিন্তু তেমন সরবে আসতে পারেননি দুর্ভাগা নারী লুৎফুন্নেসা। ইতিহাসে বার বার উপেক্ষিতা রয়ে গেছেন তিনি। সিরাজকে হত্যা করে নবাব হলো মীর জাফর। তাঁকে নবাব বানালেন ক্লাইভ। সিরাজউদ্দৌলার কনিষ্ঠ ভ্রাতা ১৫ বছরের মির্জা মেহেদীকে হত্যা করা হলো মীর জাফর ও মীরনের নির্দেশে। অন্ধকার কারাগারে প্রকোষ্ঠে হত্যা করা হলো মির্জা মেহেদীকে (নিহত ১৭৫৭ খ্রি:)।
সিরাজউদ্দৌলার হত্যার পর (৩’রা জুলাই ১৭৫৭ খ্রিঃ) মীর জাফর সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যা উম্মে যোহরা, শাশুড়ী সিরাজ মাতা আমেনা বেগম, খালা ঘষেটি বেগম এবং সিরাজের নানী সরফুন্নেসাকে নির্বাসনে পাঠানো হয় জিনজিরায়। তাদের খাওয়া দাওয়া বাবদ সে সময় সামান্য অর্থ আসতো অনিয়মিত। ফলে চরম দারিদ্রের মধ্যে দিনযাপন করতে হয়েছে তখন এসব নারীদের। ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে রেযা খাঁকে ঢাকার নায়েব সুবাদার করা হলো। তিনি নবাব পরিবারের এই নারীদের জন্য সামান্য ভাতা বরাদ্দ করেন। সাত বছর পর ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারী মাসে ঢাকার জিনজিরার বন্দীখানা থেকে মুক্তি পেয়ে মুশির্দাবাদ এলেন লুৎফুন্নেসা, তাঁর কন্যা উম্মে যোহরা ও আলীবর্দী খাঁর পত্নী সরফুন্নেসা। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যার ভরণ পোষণের জন্য মাসিক ৬০০/- টাকা বরাদ্দ করেন।
ঢাকার জিনজিরার প্রাসাদ কয়েদখানার প্রতিটি ইটে মিশে থাকা লুৎফুন্নেসা, আমেনা বেগম, সরফুন্নেসা ও ঘষেটি বেগমের বুকভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাস, আর্তনাদ ও গোঁঙ্গানির কান্নার আওয়াজ আজও শুনতে পাওয়া যায়। ইতিহাসের ছাত্র কান পাতলেই তা’ শুনতে পাবে। সেই ইতিহাস আমাদের পূর্বপুরুষের করুণ ইতিহাস। সেই ইতিহাস এক অব্যক্ত বেদনার ইতিহাস।
তাই আজ এতদিনে জেগে উঠেছে সিরাজউদ্দৌলার বংশধরদের ইতিহাস। ইতিহাস কখনোই থেমে থাকেনি।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে সিরাজউদ্দৌলার একমাত্র নাতি উম্মে যোহরার পুত্রের নাম মির্যা শমশির আলী খান। মির্যা শমশির আলী খানের একমাত্র পুত্র মির্যা লুৎফে আলী খান। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে লুৎফে আলীর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারী হন একমাত্র কন্যা ফাতিমা বেগম। ফাতিমা বেগমের গর্ভে জন্ম নেয় ৩ কন্যা লতিফ-উন-নিসা, হাসমত আরা বেগম ও উলফ্-উন-নিসা। ফাতিমা বেগম মারা যান ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে। ফাতিমা বেগমের কন্যা হাসমত আরা বেগমের বিয়ে হয় মোহাম্মদ রেযা খানের ভাই আহাম্মদ খানের এক অধঃস্তন পুরুষ সৈয়দ আলী রেযার সঙ্গে। সৈয়দ আলী রেযা ও হাসমত আরা যথাক্রমে ১৮৯৭ ও ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। এই সৈয়দ আলী রেযার পুত্র সৈয়দ যাকি রেযা ও কন্যার নাম হলো তিলাত আরা বেগম। এই সৈয়দ যাকি রেজা মুর্শিদাবাদের সাব-রেজিষ্ট্রার ছিলেন।
সিরাজের কন্যা উম্মে যোহরা ও তাঁর স্বামী মুরাদ-উদ-দৌলার এক কন্যা সাকিনা বেগমের দুই জন কন্যা ছিলেন তারা হলেন খয়ের-উন-নিসা ও ফাতেমা বেগম। পরবর্তীতে খয়ের-উন-নিসার মেয়ে ছিলেন জীনা বেগম এবং ফাতেমা বেগমের এক ছেলে ছিল তাঁর নাম মোহাম্মদ আলী খাঁ। সৈয়দ যাকি রেযার পরিবারের দুর্গতির কথা ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর কর্ণগোচর হলে তিনি ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন বাংলার গভর্ণর এইচ এফসি সাম্মান (আই.সি.এস) কে অনুরোধ করেছিলেন সৈয়দ যাকি রেযাকে একটি ভাল চাকরী দেয়ার জন্য। সৈয়দ যাকি রেযার ৪ পুত্র সৈয়দ গোলাম হায়দার, সৈয়দ মহসিন রেযা, সৈয়দ গোলাম আহম্মদ, সৈয়দ গোলাম মর্তুযা। সৈয়দ গোলাম আহম্মদের এক ছেলে সৈয়দ রেযা আলী এবং ২ কন্যারা হলেন খুরশিদা বেগম ও মুগরা বেগম। এরা দীর্ঘ সময় মুর্শিদাবাদে ছিলেন।
এরা চলে আসেন ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। সৈয়দ গোলাম হায়দার, সৈয়দ মহসিন রেযা ও সৈয়দ গোলাম আহম্মদ বদলী হয়ে চলে যান যথাক্রমে করাচী, রাওয়াল পিন্ডি ও লাহোরে। সৈয়দ রেযা আলী থেকে যান খুলনা কাস্টমসে। সৈয়দ গোলাম মর্তুযা এসে যোগ দেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার অফিসে। “সাপ্তাহিক পলাশী” পত্রিকায় ১৪ আগষ্ট ১৯৯২ সংখ্যায় প্রকাশিত এক সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে (সম্পাদক ড. মুহম্মদ ফজলুল হক) “বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সপ্তম বংশধর গোলাম মর্তুযা ৮২ বছর বয়সে ১৯ জুলাই ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই পুত্র, কন্যা, নাতি নাতনী সহ অসংখ্য আত্মীয় স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁকে খুলনার টুটপাড়া গোরস্তানে ২০ জুলাই ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে দাফন করা হয়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সৈয়দ গোলাম মর্তুযা সাহেবের পুত্র সৈয়দ গোলাম মোস্তফা বর্তমানে আছেন ঢাকায়। অন্য পুত্র গোলাম মোহাম্মদ খুলনাতেই ব্যবসা করতেন। তাঁরা ২ জন হলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার অষ্টম বংশধর। সৈয়দ গোলাম মোস্তফার বড় ছেলে সৈয়দ গোলাম আব্বাস আরেব নবাব সিরাজউদ্দৌলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষার্থে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি এখন সিরাজউদ্দৌলার নবম পরিবারের প্রজন্ম।
চিৎপুর খান্দানের বাইরে বিয়ে হয়েছিল সিরাজউদ্দৌলার একমাত্র মেয়ে (সিরাজউদ্দৌলার স্ত্রী লুৎফুন্নেসার একমাত্র গর্ভজাত কন্যা) উম্মে যোহরার একমাত্র পুত্র মির্যা শমশির আলী খানের দৌহিত্রী ফাতিমা বেগমের মেয়ে উলফ-উন-নিসার মুর্শিদাবাদের সুলতান আমীর মির্যার সাথে। তাদের ৫ পুত্র ও ৫ কন্যার একপুত্রের বংশধর আহমদ মির্যার ৩ পুত্রের নাম ওয়াজেদ মির্যা, ইশতিয়াক মির্যা ও ইমতিয়ায মির্যা। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর এরা সবাই খুলনাতেই আছেন। ছোটখাটো চাকরী করেছেন খুলনা কালেক্টরেটে। বর্তমানে তাঁরা সবাই অবসর জীবন যাপন করছেন।
বাংলাদেশ থেকে কোনো সরকারি সাহায্য বা ভাতা তাঁরা আজ অবধি পান নাই। এ এক ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। অকাল প্রয়াত, চরম নৃশংসতার শিকার বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার বংশধরগণ আজও অবহেলিত, উপেক্ষিত। জাতির জন্য সত্যিই এ’ এক চরম বেদনাদায়ক ঘটনা। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো এই যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না। তারপরও নবাব সিরাজউদ্দৌলা বাঙ্গালী সমাজ ও বাঙ্গালী মুসলিম জাতিসত্ত্বার ইতিহাসে মহানায়কের আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন। তিনি হলেন স্বাধীতা রক্ষার প্রথম শহীদ এবং একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক।
Related News
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা, ভোট হবে ৭ ধাপে
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সারাদেশের ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সম্ভাব্য দিনক্ষণ নির্ধারণ করেছেRead More
গ্যাস-বিদ্যুৎ কাল রাত থেকে স্বাভাবিক হবে: আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: আগের মতো গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেকRead More



Comments are Closed