সর্বশেষ

শিক্ষক আন্দোলন ও বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রত্যাশা

বৈশাখী নিউজ ২৪ ডটকম । প্রকাশিতকাল : ৩:৫২:২২,অপরাহ্ন ০১ অক্টোবর ২০১৭ | সংবাদটি ১৫০ বার পঠিত

প্রভাষক জ্যোতিষ মজুমদার: মানুষের মধ্যে যে সমস্ত মানবিক গুণাবলী রয়েছে, শিক্ষা সেগুলোকে বিকশিত করে। শিক্ষা মানব জীবনকে পরিশীলিত করে। তাই শিক্ষা জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতির প্রধান ধারক ও বাহক। আর এজন্যই শিক্ষাকে জাতির মেরুদন্ড হিসেবে আখ্যাতিয় করা হয়। শিক্ষা কথাটি বললেই প্রথমে যে কথাটি আসে তা হল শিক্ষক। কেননা যেকোন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে শিক্ষক। শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত উৎকর্ষ নির্ভর করে শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা, নিষ্ঠা ও প্রচেষ্টার উপর। এই চরম সত্যটি পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত। নিষ্ঠাবান ও মেধাবী শিক্ষকেরাই মূল্যবোধ সম্পন্ন শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের সংকট উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
শিক্ষকদের অবদানকে স্মরণ করার জন্য জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কোর সদস্যভুক্ত প্রতিটি দেশে ১৯৯৫ সাল থেকে ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করা হয়। ইউনেস্কো মনে করে শিক্ষা ও উন্নয়নে শিক্ষকরাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে থাকেন। পৃথিবীর সকল শিক্ষকদের অবদানকে স্মরণ করার জন্য জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কোর ডাকে এ দিবসটি পালন করা হয়।
দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য- জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মর্যাদা ও মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নে শিক্ষকদের গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করা এবং প্রবীণ শিক্ষকদের অভিজ্ঞতাকে জানা ও কাজে লাগানো।
১৯৯৩ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ২৬তম অনুষ্ঠানে ৫ অক্টোবরকে বিশ^ শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপর ১৯৯৪ সালে প্রথমবার দিবসটি পালন করা হয়। তবে ১৯৯৫ সাল থেকে বিভিন্ন শিক্ষকগণ মোটাদাগে “বিশ্ব শিক্ষক দিবস” উদযাপন শুরু করেন। বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে এই দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। এই দিবসটি পালনে এডুকেশন ইন্টারন্যশনাল (ই.আই) ও তার সহযোগী ৪০১টি সদস্য সংগঠন মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। দিবসটি উপলক্ষে এডুকেশন ইন্টারন্যশনাল প্রতি বছর একটি প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করে থাকে, যা জনসচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে শিক্ষকতা পেশার অবদানকেও স্মরণ করিয়ে দেয়।
তবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই দিবসটি বিভিন্ন তারিখে পালিত হয়। যেমন ভারতে ৫ সেপ্টেম্বর (ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি ড. রাধাকৃষ্ণণের জন্মদিন), আফগানিস্তানে ১৫ অক্টোবর, আর্জেন্টিনায় ১১ সেপ্টেম্বর, বিশ্বের ১১টি দেশে ২৮ ফেব্রয়ারী একাযোগে শিক্ষক দিবস পালন করে থাকে। আরো ১৫টি দেশ ৫ অক্টোবর দিবসটি পালন করে।
বিশ্বের শিক্ষক সমাজ যখন বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করতে প্রস্তুত, ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজ বিভন্ন সংগঠনের ব্যানারে শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবীতে রাস্তা নেমেছে। বিভিন্ন বঞ্চনার বেড়াজালে আবদ্ধ শিক্ষক সমাজের দাবী আদায়ের জন্য বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী ফোরাম আগামী ১৯ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার মহাসমবেশের ডাক দিয়েছেন।
স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে শিক্ষক সমাজ এখনও অর্থনৈতিক পরাধিনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেননি। বেসরকারি শিক্ষকরা আজও অবহেলিত। একজন কলেজ শিক্ষক হিসেবে আমি দেখেছি সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী হয়েও একজন কলেজ শিক্ষক প্রভাষক হিসেবে যোগদান করে ২৫/৩০ বছর চাকুরী করেও প্রভাষক হিসেবেই অবসর গ্রহণ করেন। যে অবস্থান থেকে চাকুরী জীবন শুরু সেখানে শেষ। বলুন এটাকি ভাবা যায়? এখানেই শেষ নয়, স্বল্প বেতনের শিক্ষকতা জীবনের অবসান ঘটিয়ে জীবন সায়াহ্নে অবসর সুবিধার অর্থে দুশ্চিন্তাহীন দিন গুজরানোর স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে শিক্ষকদের। অবসরে যাবার কত বছর পর পেনশনের টাকা জুটবে তা অবসরগ্রহণকারী শিক্ষক যেমন জানেন না, তেমনি জানেন না প্রদানকারী ব্যক্তিগণও। এর চেয়ে লজ্জার, অপমানের আর কি হতে পারে।
স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এমপিও ভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর ভাগ্যোন্নয়ন ঘটেনি। দুঃখ-দুর্দশা, সীমাহীন বৈষম্য প্রতিনিয়ত শিক্ষক-কর্মচারীদেরকে ক্ষত বিক্ষত করে তুলেছে। জনগণ তথা জাতির আশা আকাঙ্খা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে তৈরি করা হয়েছে- জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০। কিন্তু শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের কারিগর শিক্ষক-কর্মচারীদের সুবিধা বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। শিক্ষক-কর্মচারীদের নেই বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা, বৈশাখী ভাতা, পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ভাতা, পূর্ণাঙ্গা বাড়ি ভাড়া। অথচ বেসরকারি শিক্ষকগণ দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শতকরা ৯৮.৫৪ ভাগ শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে থাকেন। যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকা সত্তে¡ও বেসরকারি শিক্ষকগণ পায় সরকারি অনুদান সহয়তা। লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের বর্তমান যুগে পরিবার পরিজন নিয়ে স্বাভাবিক জীবন পরিচঅনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আমরা বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীগণ আর কতকাল বৈষম্যের শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন পরিচালনা করে যাবে? দেশে সর্বক্ষেত্রে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য এখনও দূর করা হয়নি, যা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে অপরিহার্য দাবি।
মহান সংবিধানে উল্লেখিত শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষায় বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা দূরীকরণে আমাদের প্রধান মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করণে আমাদের প্রাণের দাবি শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ।
প্রতিযোগিতাময় বিশ্বায়নের এ যুগে ক্ষুধার্থ শিক্ষক দিয়ে তৃষ্ণার্থ শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন মেটানো কোন ভাবেই সম্ভব নয়। এটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উপলব্ধি করতে হবে। বেসরকারী শিক্ষকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদনের উপর জাতির কৃষ্টি, সভ্যতা ও সমৃদ্ধি নির্ভর করে। কিন্তু শিক্ষার সেই প্রাণ বেসরকারী শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবসময়ই সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার। কিন্তু কেন? আমরা কি একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ আশা করতে পারি না?
শিক্ষকতা সমাজ ও রাষ্ট্রের সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন পদ। একজন মানুষের জীবনে তার পিতা-মাতার পরই সর্বোচ্চ আসনে শিক্ষকদের স্থান। দেশের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত মহামান্য রাষ্ট্রপতিও যদি তাঁর শিক্ষককে সামনে দেখেন, তখন শ্রদ্ধায় মাথা নত করেন। আর সেই শিক্ষকরাই আজ সমাজে বঞ্চিত, নির্যাতিত, নিষ্পোষিত ও অবহেলিত।
বাংলাদেশকে বিশ্বমানে উত্তীর্ণ করার জন্য সরকার এবং বিরোদী দল বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বক্তব্য প্রদান করেন। বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার মডেল হিসেবে দাড় করাণের প্রতিশ্রতিও অনেকে দিয়ে থাকেন। বিগত ২০১০ সালের ১২ মে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এবং ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঘোষণা দিয়েছিলেন তাঁর দল (বিএনপি) ক্ষমতায় গেলে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকুরী জাতীয়করণ করবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন দাবী আদায়ে শিক্ষকদের রাস্তায় নামতে হবে না।
দিন বদলের সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকল কলাকৌশলীদের প্রতি সবিনয় অনুরোধ বেসরকারি শিক্ষকদের সমস্যা সমাধানে জাতীয়করণের ব্যবস্থা দ্রæত গ্রহণ করুন, তবেই কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
লেখক: প্রভাষক, ইছামতি ডিগ্রি কলেজ।

 






Related News

  • মুক্তিযোদ্ধা ম. আ. মুক্তাদির বিপ্লবী চেতনার এক স্ফুলিঙ্গের নাম
  • সাংবাদিক সঞ্জিব চৌধুরী : অসাম্প্রদায়িক নিরহংকার মানুষের প্রতিকৃত
  • প্রবাস জীবনের ঈদ…
  • ঈদুল আযহার তাৎপর্য ও কুরবানীর শিক্ষা
  • বিশ্ব বরণ্য ওলী হযরত শাহ্ জালাল ইয়ামনী (রহ.)
  • জীবনের জন্য সবুজের বিপ্লব
  • দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের জীবিত এক বীর সেনানী শাহ নূর মোহাম্মদ এর কথা
  • আধুনিক কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রূপকার মরহুম হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী
  • Comments are Closed