সর্বশেষ

জাফর ইকবালের সঙ্গে আমাকে জড়িয়েও নানা কথাবার্তা হতো : ববিতা

বৈশাখী নিউজ ২৪ ডটকম । প্রকাশিতকাল : ৮:৪৯:১২,অপরাহ্ন ৩১ জানুয়ারি ২০১৬ | সংবাদটি ৯৯৪ বার পঠিত

বিনোদন ডেস্ক: ববিতা, বাংলা সিনেমার রাজকন্যা। সম্প্রতি এই রাজকন্যার দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকার নেন প্রথিতযশা বিনোদন সাংবাদিক আব্দুর রহমান। চ্যানেল আই’তে প্রচারিত এই সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
আব্দুর রহমান: আমি এই মুহূর্তে রাজকন্য ববিতার সঙ্গে কথা বলছি। ববিতা আপনাকে শুভেচ্ছা।
ববিতা: আপনাকেও শুভেচ্ছা।
রহমান: আপনার ক্যারিয়ার যদি পর্যালোচনা করি। তাহলে দেখব আপনার অভিষেক নায়করাজ রাজ্জাকের সঙ্গে। তিনিও আপনাকে পছন্দ করেন..
ববিতা: আমাদের ভেতর মিল আছে। জহির ভাইয়ের হাত ধরে রাজ্জাক ভাই এসেছেন, আমিও এসেছি…আমি বেণী দোলানো কিশোরী আর রাজ্জাক ভাই টগবগে যুবক। প্রথমে সংসার ছবিতে অভিনয় করতে বলা হয়েছে। ছবিতে রাজ্জাক ভাই বাবা ছিলেন আর সুচন্দা আপা ছিলেন মা। তো ঐ ছবিটা করেছি। রিলিজ হলেও ছবিটা তেমন চলেনি। এই ছবিটা করার সময় আমি ভেবেছিলাম এই ছবিটা করার পর আমি আর কোন ছবি করবো না। এরপর জহির ভাই বললেন আমি ববিতাকে নায়িকা করে আরেকটা ছবি বানাব। ছবিটা হচ্ছে ‘শেষ পর্যন্ত’।
প্রথম যখন শুটিং হচ্ছিল। তখন খুব আন ইজি ফিল করছিলাম কারণ এই কয়দিন আগেই রাজ্জাক ভাইকে বাবা ডাকলাম এখন আবার রোমান্টিক দৃশ্য। আমি পারছিলাম না, খুব আন ইজি ফিল করলাম। তো জহির ভাইয়ের খুব বকা খেলাম। তিনি বললেন এটা কি সত্যি নাকি এটা তো অভিনয়। পরে বকা খেয়ে ঠিক করে ফেলেছি। ঐ ছবিতে এত মিষ্টি ডায়লগ, এত সুন্দর গান আর এত সুন্দর ছবি ছিল যে পরে আর না করতে পারি নাই যে আমি আর ছবি করবো না। আর রাজ্জাক ভাই ছিলেন আমাদের আপনজন, পরিবারের সদস্যের মতো। আমি সৌভাগ্যবান যে আমি উনার সঙ্গে অনেক ছবি করতে পেরেছি।
রহমান: আপনি নিজেও আমাদের ইন্ডাস্ট্রির অনেক বড় একটি সম্পদ। এখন পর্যন্ত আপনি আপনার রূপ লাবণ্য ধরে রেখেছেন-এটা কী করে সম্ভব?
ববিতা: এটা আপনারা ভালোবেসে বলছেন আর কি। আর আমি তো সবার ভালোবাসা নিয়েই আমি ববিতা। এই যে যারা আমাকে অভিনয় শিখিয়েছেন, পথচলা শিখিয়েছেন তাঁদের কথা আমি ভুলতে পারবো না। তাদের জন্যই আজকে আমি ববিতা হতে পেরেছি।
রহমান: আপনার তো অনেকগুলো বিখ্যাত ছবি, আলোর মিছিল (১৯৭৪ সালের ছবি) এ ছবিতেই আপনি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন। আর্টিস্ট ছিলেন রাজ্জাক ভাই কিন্তু উনার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ছিল অন্যরকম। আলোর মিছিলের গল্পটুকু…
ববিতা: যখন নারায়ণ ঘোষ মিতার মতো এত বড় একজন পরিচালক আমার কাছে এলেন এবং গল্পটা বললেন তখন গল্পটা শুনে দারুণ লাগল। তখন একটা প্রবলেম হলো যে, আমার অনেক শুভাকাঙ্খী বলল যে তুমি এই ছবিটা করো না। আমি বললাম কেন? তারা বলল যে রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে তুমি রোমান্টিক ছবি করো কিন্তু এখানে রাজ্জাক ভাই তোমার মামা হবে আর তুমি হবে ভাগ্নি । এটা কিন্তু তোমার ক্যারিয়ারের জন্য প্রবলেম হয়ে যাবে। আমি বললাম যে আমাকে একটু ভাবতে দেন। পরে দেখলাম গল্পটা এত সুন্দর এত ভাল যে, আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে যাই বলুক না কেন আমি এই ছবিটা করবো। সিনেমা রিলিজ হওয়ার পর সিনেমা হলে দর্শকদের হাউ মাউ করে কাঁদতে দেখেছি। যখন আলো মারা গেল, যখন রাজ্জাক ভাই রোজী ভাবিকে গিয়ে বলছে আলোকে দাফন-কাফন করা হবে আসো। তখন পরিচালক শর্ট নিয়েছেন এমন যে, একটা ফটোর উপর চার্জ হচ্ছে । এই যে ঐখানে যখন চার্জ হয়েছে তখন দর্শকরা হুহু করে কেঁদে ফেলেছে।
রহমান: টাকা আনা পাই?
205787_235345949935672_1480303267_nববিতা: খুবই সুন্দর। এই ছবি মুক্তির পর টিনএজ ছেলে মেয়েরা ববিতার এত ভক্ত হয়ে গেল যে বলার বাইরে। আর জহির ভাই গল্পটা এমন করে নির্মাণ করেছিল ‘ঐ ছোট্ট একটা মেয়ে, মাথায় হালকা পাতলা ছিট আছে, বড় লোকের মেয়ে, যে রাজ্জাক ভাইকে গিয়ে বলছে- হ্যাঁ তোমাকে পাখি ধরে দিতে বলেছিলাম দাওনি-আবার আমার বাড়িতে বসে বসে চা খাচ্ছ না, লজ্জাও করে না! এই যে মজার মজার ডায়লগগুলো এগুলোতে লোকে খুব মজা পেয়েছিল। রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে অসংখ্য ভাল ভাল ছবি করেছি। সো আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। রাজ্জাক ভাই তো আমাদের চলচ্চিত্র জগতের একটা ইনস্টিটিউশন। রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করতে কি যে ভাল লাগত। উনি সবসময় গাইড করতেন-এই তোমার অভিনয় ঠিক হচ্ছে না। এভাবে করো। এখানে এরকম করো, ওখানে ওরকম বলো- এই যে জিনিসগুলো এভাবেই তো শেখা আমাদের। আমি প্রাউড যে রাজ্জাক ভাইয়ের নিজের প্রোডাকশন রাজলক্ষি প্রোডাকশনের ম্যাক্সিমাম ছবির নায়িকা কিন্তু আমি ছিলাম। আরও বড় কথা রাজ্জাক ভাইয়ের নিজের ডাইরেকশনের যে ছবি ‘অনন্ত প্রেম’ সেটারও নায়িকা আমি। সেটা যে কি সুন্দর!
রহমান: চুমুর দৃশ্য?
ববিতা: ও (হাসি) তাহলে আপনি যখন বললেন তখন বলি। আরে ওই ছবির যে একটা গান ছিল-ওই যে ‘ওই চোখে চোখ পড়েছে যখনি… আমি জানি না ঐ গানটা এখন আর আছে কিনা। খুব দেখতে ইচ্ছে করে।
এই ছবির ভেতর একটা ব্যাপার ছিল। ছবিতে শেষ দৃশ্যে আমাদের একটা চুম্বন ছিল। তো রাজ্জাক ভাই আমাকে বোঝাচ্ছেন যে তুমি বিষ খেয়েছো, আমি তোমাকে চুমু খাচ্ছি-এরপর আমরা দুজনই মারা যাচ্ছি-এরকম একটা ব্যাপার। তো রাজ্জাক ভাইয়ের কথা শুনে তো আমি ইমোশনাল হয়ে শর্ট দিচ্ছি, কাঁদতেছি। আমার অভিনয় নাকি খুব সুন্দর হয়েছে সবাই হাততালিও দিয়েছে। খুব ভাল ভাল। তো শুটিং টুটিং করে এসে রাজ্জাক ভাই জড়িয়ে ধরেছে, খুব ভাল অভিনয় করেছো। তো রাত্রে বেলায় কাপ্তাইয়ের যে কটেজে আমি ছিলাম সেখানে এসে কাঁদছি। এটা রাজ্জাক ভাইয়ের কানে গেল। তিনি বললেন কি হয়েছে রে, ববিতা বলে কাঁদছে। কাঁদছে কেন? উনি এসে বলছেন ববিতা তুমি কাঁদছ কেন? আমি বললাম এমন দৃশ্যে অভিনয় করলাম আমার তো আর বোধহয় বিয়ে টিয়ে হবে না। কেন কেন তুমি এটা ভাবছ কেন? না রাজ্জাক ভাই এরকম দৃশ্যে অভিনয় করলাম। মানুষ দেখবে এরকম কিস-এর দৃশ্য। তখন রাজ্জাক ভাই বললেন ডোন্ট ওরি, আমরা এটা দেখব যদি খারাপ লাগে তাহলে আমরা এটা কাটবো না কিন্তু অন্যভাবে উপস্থাপন করবো। তো রাজ্জাক ভাই তাই করলেন।
রহমান: কী দুঃসাহস!
ববিতা: দুঃসাহস মানে। রাজ্জাক ভাইয়ের ডাইরেকশন দিচ্ছেন। কাপ্তাইয়ের গহীন জঙ্গলে যেতে হবে। ওখানের আর্মি-পুলিশ যারা ছিল তারা বলল দেখেন আপনারা সেখানে যেতে পারেন কিন্তু নিজেদের রিস্কে যেতে হবে। আমরা কিন্তু আপনাদের প্রটেকশন দিতে পারব না। যাই হোক আমরা গেলাম। আমি রাজ্জাক ভাইয়ের নায়িকা, আমার যাতে কষ্ট না হয় সেজন্য রাজ্জাক ভাই আমার জন্য একটি পাল্কি বানিয়েছেন। ছোট্ট একটি পাল্কি। উনি বললেন আমার নায়িকা অতদূর হেঁটে যেতে পারবে না, ও হাঁটতে পারবে না, ওকে ফ্রেশ থাকতে হবে-তো আমাকে পাল্কিতে করে নিয়ে নামানো হতো আমরা শুটিং করতাম।
রহমান: একসময়ে তুমুল আলোচনা উঠেছিল যে আপনার ব্লাউজের আদলের ব্লাউজের কাট্টি বেশি হতো। বাংলাদেশে আপনিই একমাত্র অভিনেত্রী ছিলেন যার ফ্যাশন বাংলাদেশের মেয়েরা খুব অনুকরণ করত…
ববিতা: হ্যাঁ, এটা খুব মজার ব্যাপার ছিল, তখন আমি যে ধরনের ব্লাউজ পরতাম আমার সব ভক্তরা ট্রেইলারের কাছে গিয়ে বলত ববিতা ব্লাউজ। শুধু তাই নয়, আমি হেয়ারকাট যেটা করতাম তখন পার্লারে গিয়ে মেয়েরা বলত যে ববিতা হেয়ারকাট করে দাও।
রহমান: এই কাজগুলো, এই চিন্তাগুলো আপনি কখন করতেন? একটু ডিফরেন্স ড্রেস, আলাদা হেয়ারকাট…
379176_235352816601652_1248490817_nববিতা: হ্যাঁ, আমি সবধরনের চরিত্রই তো করেছি। সেই গ্রামীণ চরিত্র বা ইয়ে সবকিছু। মজার ব্যাপার ছিল। আমার খুব বিদেশে যাওয়া পড়ত- হয় ফেস্টিভেলে, নয় এটা সেটার কাজে। লন্ডনে বা নানা জায়গায় যেতে হতো। সেখান থেকে ড্রেসসহ নানাকিছু আনতাম। এই এত বছর অব্দি আমি কিন্তু প্রডিউসারদের দেওয়া পোশাক-আশাক পড়িনি।সবসময় আমার নিজস্ব পোশাক পড়েছি। আমার চরিত্র কি হবে সেই ধরনের ভেবে এমনকি আমার যে কো-আর্টিস্ট থাকবে তারজন্যও।আমি এমনটা করেছি যে যখন বিদেশে গিয়েছি তখন আমি ভাবতাম যে মডার্ন কোন ছবিতে আমি এরকম ড্রেস পরব তখন আমি ভাবতাম কিন্তু আমার নায়কের ড্রেস যদি ভাল না হয় তাহলে আমার সঙ্গে মিলবে না। আমার প্রডিউসার তাকে ভাল ড্রেস দিল না তখন তো ভাল দেখাবে না। তখন নায়কের ড্রেসও আমি কিনে আনতাম। এটা কোনদিন বলা হয়নি আপনাকে আজ প্রথম বললাম।
রহমান: সেজন্যই অন্যদের থেকে একটু আলাদা মনে হয় আপনাকে..
ববিতা: সত্যি নাকি! (হা হা হা)
রহমান: রাজ্জাক ভাইয়ের প্রসঙ্গে এবার একটু আসি। মাঝে মাঝেই আসব আবার মাঝে মাঝেই অন্য প্রসঙ্গে যাবো। রাজ্জাক ভাই আপনার পরিচালক ছিলেন আপনার অভিনেতা ছিলেন এবং অভিবাবকসুলভ একটা ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। তো আমার যতটুকু কানে এসেছে জানিনা সত্য কিনা। আপনার বিয়ের দিন রাজ্জাক ভাইয়ের..
(মুখে হাত দিয়ে লজ্জায় হেসে ফেলেন ববিতা)
ববিতা: ও মাই গড। আপনি যখন কথাটা তুললেনই তখন আমাকে বলতেই হয়। আমার বাবা মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। তো আমার বাবা বললেন যে মা আমি মৃত্যুর আগে তোমার বিয়েটা দেখে যেতে চাই। ভাল কথা। আব্বা বললেন যে তোমার যদি কাউকে ভাল লাগে তো বল আর না হলে আমরা সবাই দেখি। তো সুচন্দা আপা, আমার দোলা ভাইসহ সবাই খোঁজ করে অনিকের আব্বা মানে আলম সাহেবের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করে। তো যেদিন বিয়ে হবে-বাবা মৃত্যু শয্যায়। ওখানে আমার বর বা উকিল বাপ-টাপ সবাই আসবেন। ঐখানে বিয়েটা হয়ে যাবে আর রাত্রে আমি সব জার্নালিস্টকে দাওয়াত দিলাম সোনার গাঁও হোটেলে।
রহমান: আমিও ছিলাম
ববিতা: ও আপনিও ছিলেন। তো সবাইকে দাওয়াত দেওয়া হলো। কিন্তু কি ব্যাপার সেটা বলা হবে না। তো সবাই দেখল যে কি ব্যাপার গিয়ে দেখি কি হয়। যেদিন বিয়ে হবে সেদিন হলো কি-আমি ভাবলাম আচ্ছা আমি যেহেতু বিয়ে করছি আমার বিয়ের জীবনটা যদি সুখের না হয়, ভাল না হয় তাহলে কি হবে। তো এরকম কিছু চিন্তা টিন্তা মাথায় এল। সকাল বেলায় বরপক্ষ আসবেন দশটা এগারটার দিকে। তো আমি কি করলাম। পেছনের দরজা দিয়ে গাড়ি নিয়ে রাজ্জাক ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে হাজির। তো ফিল্ম লাইনের কেবল রাজ্জাক ভাই আর লক্ষী ভাবীই জানতেন যে আজকে ববিতার বিয়ে হচ্ছে আর কেউ জানতেন না। তার মানে দেখেন রাজ্জাক ভাই আমার কতটা আপন। রাজ্জাক ভাই বললেন ববিতা আজ তুই এখানে কেন? তো আমি লক্ষী ভাবীকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বললাম ভাবী আমার দ্বারা হবে না। আমার ভয় লাগছে। আমি পারব না। তারপর রাজ্জাক ভাই এবং ভাবী আমাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে বললো প্রথমে একটু ভয়টয় লাগবেই, পরে ঠিক হয়ে যাবে। পরে বলল এই লক্ষি তুমি নিজে ববিতাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে এসো। তারপর ভাবী আমাকে নিয়ে আসছেন।
রহমান: অনেকেই যেটা প্রশ্ন করেন অভিযোগ করেন যে রাজ্জাক ভাইয়ের ছবিতে আরও একজন তো থাকতে পারত, মানে কবরী আপার কথায় বলছি।
ববিতা: ও আচ্ছা।(হাসি)
রহমান: পর্দায় তাদের যে রোমান্টিক জুটি। তার চেয়ে কিন্তু বেশি ছবি রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে আপনি করেছেন-
ববিতা : হ্যাঁ অনেকগুলো ছবি রাজ্জাকভাইয়ের সঙ্গে করেছি।
রহমান: ববিতা এবং রাজ্জাকের ছবিই কিন্তু বেশি। ফলে ঐ যে মুখরোচক একটা গল্প কিন্তু চিরকাল রয়েই গেল…একটা প্রেম, একটা ভালোবাসা, রাজ্জাক ভাইকে কি কখনো নায়ক হিসেবে ভাবেননি?
ববিতা: না, রাজ্জাক ভাইকে কি বলবো। একজন গার্জিয়ান একজন আপন লোক আবার যখন লাইলী মজনু করেছি বা রোমান্টিক ছবি করেছি তখন তো সে ব্যাপারটা রয়েছে এবং অদ্ভুত একটা ব্যাপার।
রহমান: কিন্তু আমরা যখন পিচঢালা পথ দেখি, কি অদ্ভুত কি সুন্দর দুইজন আপনি, একটা বিখ্যাত গানও আছে কিন্তু..
ববিতা: হ্যাঁ, রাজ্জাক ভাই গাড়ি চালাচ্ছিল, ঐ যে ফুলের কানে ভ্রমর এসে চুপি চুপি বলে যায়, তোমায় আমায় সারাটি জীবন নিরবে জড়াতে চায়…আর কিছু ছবি জাফর ইকবাল ভাইয়ের সঙ্গে করতাম তো তখন, জাফর ইকবাল ভাইয়ের সঙ্গেও আমাকে নিয়ে কিছু মুখরোচক কথাবার্তা হতো। উনি গান গাইতে পারত। কি অদ্ভুত গলা। গিটার বাজাত এবং শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে ও আমাকে গান শিখিয়েছে। মজার ব্যাপার ও ইংরেজিতে কিছু গান আমাকে শিখিয়েছিল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মঞ্চে অনুরোধ আসত জাফর ইকবাল ববিতার গান শুনব।
রহমান: তার একটি বিখ্যাত গান আছে। সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী।
ববিতা: তখন পত্র-পত্রিকায় আমাকে ও জাফর ইকবাল নিয়ে প্রচুর মুখরোচক গল্প হতো। তো জাফর ইকবালেরও বিয়ে হয়ে গেল আমারও বিয়ে হয়ে গেল। তখন টিভিতে ও এই গানটি গেয়েছিল। সুখে থেকো ও আমার নন্দিনী। গানটা সাংঘাতিক পছন্দ করেছিল লোকজন। সুপার ডুপার হিট হযেছিল এবং প্রত্যেকেরই একটা ধারণা যে এটা ববিতাকে উদ্দেশ্য করে গেয়েছে ও । তো আমি তখন ইকবালকে জিজ্ঞেস করলাম। কি ইকবাল কি খবর? সত্যি কি আমাকে চিন্তা করে আপনি লিখেছেন। তখন সে বলল যে বিশ্বাস করেন আলাউদ্দীন আলী বলল এটা তুমি গাও। তুমি গাইলে সবাই বলবে এটা ববিতাকে নিয়ে তুমি গেয়েছ। তাই গাওয়া হয়েছিল। এখনো কিন্তু সবাই তাই মনে করে।
রহমান: আমরা দেখেছি, ‘বাদী থেকে বেগম’। আরেকটি চলচ্চিত্র। এখানে তিনটি রূপে আমরা ববিতা ম্যাডামকে দেখেছি।
ববিতা: আপনারা যদি জিজ্ঞেস করেন তাহলে আমার প্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে এটি একটি অন্যতম প্রিয় ছবি।
রহমান: এবং রাজ্জাক ভাই..
ববিতা: ওরে বাবা! ওটাতে রাজ্জাক ভাইও ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে এবং ববিতাও ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। তো ওখানে আমার তিন ধরনের চরিত্র। ঐ যে কখনো আমি নর্তকী কখনো আমি বাদী কখনো আমি বেগম। বিখ্যাত ‘বাদী থেকে বেগম ছবিটি লিখেছেন আমাদের শ্রদ্ধেয় আহমেদ জামান ভাই এবং আমার জীবনে যাদের অবদান রয়েছে তাদের মধ্যে আহমেদ জামান ভাই আমাকে অনেক আগলে রেখেছেন। আহমেদ জামান খোকা ভাই, অবশ্যই উনার নাম ভুলবো না। আজ উনি আমাদের মাঝে নেই। তো ঐ ছবির তিনি প্রডিউসারও ছিলেন। তো ঐ ছবিতে আমি যখন নর্তকী হলাম তখন আমাকে পিওর ক্ল্যাসিক্যাল ডান্স করতে হবে। আমি কিন্তু ডান্স জানি না।
রহমান: কিন্তু ঐ ছবি দেখে কিন্তু মনে হয়নি।
ববিতা: না্, সেটাই আমি বলতে চাইছি। তো শুটিংয়ের ফাঁকে যে এক দেড় ঘন্টা সময় থাকে সসময়ে গওহর জামিল রওশন জামিল যেখানে থাকেন সেখানে গিয়ে ‘ধা-ধিন ধিন তা’ এসব করতাম এবং এত সুন্দর করে শিখেছিলাম যে শিখতে গিয়ে আমার পায়ে ঠোসকা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু যখন ছবিটি রিলিজ পেল তখন রিয়েল ক্ল্যাসিক্যাল ডান্সাররা মনে করল ববিতা বোধ হয় রিয়েল ক্ল্যাসিক্যাল ডান্সার। কিন্তু আই অ্যাম নট ক্ল্যাসিক্যাল ডান্সার। এই যে আমাদের চেষ্টাটা। মানুষ যেন বুঝতে না পারে যে ববিতা নাচ পারে না।
রহমান: আপনি শুধু রাজজ্জাক ভাইকে যে হ্যান্ডসাম বললেন তা তো শুধু না। দুর্দান্ত রাজকন্যা তো আপনি নিজেও।
ববিতা: (হাসি)।
রহমান: এত অদ্ভুত সুন্দর কেন আপনি?
ববিতা: থ্যাংকস। দর্শকরা আমাকে অনেক ভালোবাসেন তো তাই হয়ত বলেন।
রহমান: উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের প্রবাদ পুরুষ সত্যজিৎ-এর চোখ আপনাকে আবিষ্কার করেছিল। এই গল্পটা শুনতে চাই…
379213_235352313268369_180101849_nববিতা: তখন আমি গেন্ডারিয়ার বাড়িতে থাকি। দেশ স্বাধীন হয়েছে। তো দেখি এক ক্যামেরাম্যান এফডিসিতে খুব ছবি তুলছে। তো আমি জিজ্ঞেসা করলাম উনি কে? সবাই বললো যে উনি ভারত থেকে এসেছেন। তো রাজ্জাক ভাইয়ের বাড়িতেও কিছু ছবি তুলছে। তো এর কিছুদিন পর একটা চিঠি এসেছে। বলছে যে সত্যজিৎ রায় তোমাকে নিয়ে ভাবছে। তুমি চিন্তা করতে পার। তো চিঠিটা পেয়ে আমি হাসতে হাসতে সোফায় বসা থেকে মাটিতে পড়ে গিয়েছি। আমি কে না কে। আমাকে কেউ চেনে না। সত্যজিৎ রায় ওখানকার কত বড় পরিচালক। ওখানকার কত বড় বড় আর্টিস্ট। ওদের বাদ দিয়ে আমাকে কেন নিবে। আমার মনে হযেছে কেউ দুষ্টুমী করেছে। অনেক ভক্তরা থাকে না এরকম। তো তার কিছুদিন পর ইন্ডিয়ান হাই কমিশন থেকে ফোন এসেছে। তুমি কি ব্যাপারটা দেখছো না। উনি কিন্তু তোমাকে চিঠি দিয়েছে তুমি ব্যাপারটা দেখ। তো প্রযোজক নন্দন ভট্টচারি যোগাযোগ করলেন। উনি বললেন যে তুমি কি ইন্ডিয়ায় আসতে পার। উনি তোমাকে সরাসরি দেখতে চান। পরে আপাকে বললাম। আপাতো বেশ উত্তেজিত। পরে আমরা ইন্ডিয়ায় গেলাম। তো ইভনিংয়ে উনার বাড়িতে যাব। তো আমার ম্যাকআপ বক্সে যত ম্যাকআপ ছিল সব দিয়ে সেজেগুজে সুন্দর করে গিয়েছি। এত বড় পরিচালক দেখবে আমাকে সুন্দর করে যেতে হবে না। তাই অনেক সেজেছি। সেজে টেজে গেলাম। তো আমরা গিয়ে দরজায় টোকা দিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম ভেতর থেকে এক লম্বা লোক বেরিয়ে এলেন। উনাকে একবার দেখে আমি নিচু হয়ে তাকিয়ে আছি। আমি এত ভয় পেযে গিযেছিলাম যে আমি আর তাকাতে পারছিলাম না্ । তারপর উনি বসালেন। আমি তো তখনো নিচু হয়ে আছি। উনি বলছেন যে, এত লাজুক মেয়ে। আর আমাকে বলছে যে, তুমি এত মেকআপ করে এসেছো কেন। তোমাকে তো এই মেকআপ-এ দেখতে চাইনি। তো আমি তো আরও ঘাবড়ে গেলাম। তারপর উনি সুচন্দা আপাকে বললেন ও এত লাজুক ও কি অভিনয় অভিনয় পারবে। আপা বললো যে ও তো বাংলাদেশে দু-তিনটি ছবি করেছে। খুব সুনাম হয়েছে। তো উনি বললেন তুমি আগামীকাল ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে আসবে। কোন ধরনের মেকআপ ছাড়া। তো আমি গেলাম ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে। উনি বললেন যে তোমাকে তো আজকেও সুন্দর লাগছে। মেকআপ ছাড়াই তো তুমি সুন্দর। তারপর মেকআপম্যানকে বললেন ও আটপৌরে শাড়ি পরবে সিথিতে সিদুর থাকবে ঘোমটা থাকবে আর কোন মেকআপ না। লাইট টাইট অন। আমার টেস্ট শুরু হলো। আমাকে বললেন তুমি একটার পর একটা সংলাপ বলতে থাকো। তখন আমি আরেক ববিতা। তখন আমার লাজ-লজ্জা ভয় কোনকিছুই নেই। আমি নানা চেষ্টা টেস্টা করছি। উনি লুক থ্রো করে দেখে বুঝলেন এই মেয়ের তো সাংঘাতিক চেষ্টা আছে, এই মেয়ে তো ভাল। এতো আরেক মেয়ে। ও কালকে কি ছিল আজকে কি দেখছি। উনি বললেন ইউরেকা। আমি অনঙ্গ বউ পেয়ে গেছি। কোথায় তোমার দিদি। সুচন্দা, সুচন্দা, এই হবে আমার ছবির অনঙ্গ বউ। আমি নিজেকে চিমটি কেটে বলছি-এটা কি সত্যি নাকি মিথ্যে।
রহমান: সেসময় সবাই আপনাকে সম্বর্ধনা দিয়েছেন। দেশে অনেক মাতামাতি হয়েছে।
ববিতা: এফডিসিতে অনেক বড় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হয়েছিল। খান আতাউর রহমান, চাষী নজরুল ইসলাম সহ সবাই সেখানে ছিলেন।






Related News

  • ‘জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ইলিয়াসের অপেক্ষায় থাকব’
  • ‘সালমান শাহ মিউজিয়াম করবো’
  • জাফর ইকবালের সঙ্গে আমাকে জড়িয়েও নানা কথাবার্তা হতো : ববিতা
  • কাউন্সিলর প্রার্থী ময়না’র অজানা কাহিনী
  • মডেলিং থেকে নাটকে জনি আইকন
  • ভাষা সংগ্রামে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরও অগ্রণী ভূমিকা ছিল : ভাষা সৈনিক রওশন আরা
  • প্রবীণ বাউল শিল্পী মজনু পাশা আর নেই
  • Comments are Closed