Main Menu
শিরোনাম
বিশ্বনাথে ‘ধানের শীষ’র নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধন         জৈন্তাপুরে শুকসারী ঘাট নির্মাণে গচ্ছা গেল ২০ লক্ষ টাকা         জাফলংয়ে ব্যবসায়ীকে হয়রানীর অভিযোগ         ধানের শীষ প্রতীক পেলেন ড. রেজা কিবরিয়া         শ্রীমঙ্গলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস পালিত         গোলাপগঞ্জে দুই ইউপি চেয়ারম্যান গ্রেফতার         সিলেটে একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রতীক সিংহ         সিলেটের ৬টি আসনের প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ         গোয়াইনঘাটে গরুচোরদের হামলায় নিহত ১         হবিগঞ্জে ৭ প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহার         পীরেরবাজারে ট্রাক চাপায় স্কুলছাত্র নিহত         গোলাপগঞ্জে যুবদল সভাপতি গ্রেফতার        

ঝুঁকি জেনেও অস্ত্রোপচারে সন্তান জন্মদান বাড়ছে

প্রকাশিত: ৭:০৮:৪৪,অপরাহ্ন ১৯ নভেম্বর ২০১৮ | সংবাদটি ২১ বার পঠিত

ডাঃ তানভীরুজ্জামান: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে একটি দেশে সিজারিয়ান অপারেশনের হার হবে মোট প্রসবের ১০ থেকে ১৫ ভাগ। অথচ ২০১৬ সালের হিসেবে বাংলাদেশে এই হার ৩১ ভাগ। ২০১০ সালে এই হার ছিল ১৯ ভাগ। প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে সিজারিয়ান অপারেশনের হার অনেক বেশি। সেখানে মোট প্রসবের শতকরা ৮৩ ভাগ সিজারিয়ান অপারেশন। অথচ সরকারি হাসপাতালে তা ৩৫ ভাগ। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফি অ্যান্ড হেলথ সার্ভে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৪ সালে ৪ শতাংশ, ২০০৭ সালে ৯ শতাংশ, ২০১১ সালে ১৭ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে শতকরা ২৩ ভাগ শিশুর অস্ত্রোপাচারের মাধ্যমে জন্ম হয়েছে। সাধারণত সিজার বা সি-সেকশন মা ও শিশুর জীবন রক্ষায় কার্যকর মনে হলেও অদূর ভবিষ্যতের জন্য এটা মারাত্মক প্রভাব ফেলে। প্রতিবছর লাখ লাখ নারী প্রসবোত্তর সময়ে ইনফেকশনে আক্রান্ত হচ্ছেন, বাড়ছে নবজাতকের নানা জটিলতাও। এর মাধ্যমে জন্ম নেয়া শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিও কখনো বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং সিজারিয়ান শিশু বেশি পরিমাণে ইনফেকশনের ঝুঁকিতে থাকে। আর এই মাধ্যমে সাধারণত ২৫ শতাংশ নবজাতকের নির্ধারিত সময়ের (২৫ থেকে ২৮ দিন) আগেই জন্ম হয়ে থাকে যেটা ইনফেকশনের বড় কারণ হতে পারে। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, নরমাল জন্ম নেয়া বেবির তুলনায় সিজারিয়ান পদ্ধতি সন্তান জন্ম নেয়া নবজাতকের মৃত্যুহার প্রায় ৩ গুণ বেশি। শিকাগোর ডা. এলিউট এম লেভিন ও সহযোগী গবেষকদের মতে সি-সেকশনে জন্ম নেয়া শিশুর প্রথমিক পালমোনারি উচ্চ রক্তচাপ ৫ গুণ বেশি। এমনকি প্রতি হাজারে প্রায় ৪ জন শিশুর ক্ষেত্রে এমন ঘটে যেখানে নরমাল শিশুদের প্রতি হাজারে এই হার ০ দশমিক ৮। ২০০১ সালে ফিনল্যান্ডের জার্নাল অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ইমিউনোলজি শীর্ষক প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয় যে সিজারিয়ান ডেলিভারি শিশুদের অ্যাজমা রোগের হার অনেকগুণ বেশি। আর নিউরোসাইন্স চিকিৎসকদের মতে এসব শিশু সিজোফ্রেনিয়াসহ গুরুতর মানসিক রোগে ভুগতে পারে।সেই সঙ্গে বাড়ছে মাতৃস্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং খরচ। নবজাতক ও মাতৃস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চিকিৎসাশাস্ত্রের বিবেচনায় প্রয়োজন নেই এমন ক্ষেত্রে সিজার করা হলে মায়ের প্রসব-পরবর্তী সংক্রমণ বাড়ে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। অঙ্গহানিও হতে পারে। যা প্রসূতির সুস্থ হয়ে উঠতে বেশি সময় লাগে। শুধু তাই নয়, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান ডেলিভারি সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বড় প্রতিবন্ধকতা।
সিজারিয়ান পদ্ধতির ব্যবহার বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি, সরকারের সঠিক মনিটরিং না থাকা এবং মানুষের অসচেতনতাকে দায়ী করছেন চিকিৎসকরা।

অনেক প্রসূতিবিদই বলেছেন আজকালকার অনেক মা (বিশেষ করে যারা প্রথমবারের মত মা, শহরবাসী ও শিক্ষিত) স্বপ্রণোদিত হয়ে সি-সেকশন এর মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিতে চাচ্ছেন। তাঁরা হয়তো প্রসব বেদনা সহ্য করার মতো মানসিক শক্তি সঞ্চয় করতে পারেন না। অধিকারবাদীরা বলেন আমার শরীর, আমার ইচ্ছা, আমার সিদ্ধান্ত আমি কিভাবে ডেলিভারী করাবো। আমার বক্তব্য হচ্ছে, অন্তত এক্ষেত্রে যেখানে মারাত্মক স্বাস্থ্য ও অন্যান্য ঝুঁকি এবং জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন জড়িত সেখানে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকারের আগে তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ প্রসূতি মা-টিকে সি-সেকশনের সকল ভালো মন্দ ও পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া সমূহ নির্মোহভাবে ব্যাখা করতে হবে। তথ্যপ্রদানের এই অবশ্যকরণীয় কাজটি সুচিকিৎসার অংশ। বহু দেশে চিকিৎসা শুরুর আগে পূর্বাপর ভালো-মন্দ পূর্ণাঙ্গভাবে রোগীকে না বলা কিংবা উদ্দেশ্য প্রনোদিত ভাবে বা আংশিক তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে রোগীর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর দায়িত্ব কার? আমাদের শ্রদ্ধাভাজন প্রসূতিবিদরা নিশ্চয়ই মানবেন যে, সি-সেকশন আর দশটা ওভার-দি-কাউন্টার ওষুধের মতো পণ্য নয় যে রোগী চাইলেই তথাকথিত অধিকারের নামে তা দিয়ে দেওয়া উচিত। একটা বিষয় সুস্পষ্ট, বাইরের বিভিন্ন পক্ষের যতই নিয়ন্ত্রণ থাকুক না কেন শেষ বিচারে প্রসূতিবিদকেই সিদ্ধান্ত দিতে হবে ডেলিভারিটা নরমাল হবে না সিজার হবে। ব্যক্তি প্রসূতিবিদ অথবা সামষ্টিকভাবে প্রসূতিবিদদেরই নিজেদের ওপর এই নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।

অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ করতে হলে নীচের প্রস্তাবনাগুলো বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে-
১। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে কঠোরভাবে চিকিৎসা সেবার মান-নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন করতে হবে ও তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ২। সুনির্দিষ্ট মানদন্ড মেনে চলার ভিত্তিতে হাসপাতাল, ক্লিনিক ইত্যাদির লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন করার বিধান চালু করতে হবে এবং সঠিকভাবে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত প্রসূতিবিদ ছাড়া অন্য কারো অপারেশন করা বন্ধ করতে হবে। সিজারিয়ানের অনুমতিপ্রাপ্ত প্রসূতিবিদ ও ক্লিনিক/হাসপাতালের একটি ডাটাবেইস খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তৈরী করা সম্ভব। ৩। প্রসূতিবিদদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সার্বক্ষনিক নিরীক্ষণ, জবাবদিহিতা ও পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ৪। সরকারী-বেসরকারী সকল হাসপাতাল, ক্লিনিকগুলোকে চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ ও রিপোর্টিং পদ্ধতির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। ৫। সিজারিয়ান অপারেশন ও নরমাল ডেলিভারী খরচ একরকম করতে হবে যাতে প্রয়োজনহীন সিজারিয়ান নিরুৎসাহিত হয়। ৬। অত্যাবশ্যক সি-সেকশন এর প্রয়োজনীয়তা ও অনাবশ্যক সি-সেকশনের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সমাজকে সংগঠিতভাবে একটি কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। ৭। মানদন্ড নির্ধারণ, মান-নিয়ন্ত্রণ, নিরীক্ষণ ও নিয়মিত তত্ত¡াবধান ও নৈতিকতা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে দায়িতপ্রাপ্ত সংস্থা বাংলাদেশ মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) ও অন্যান্য সংস্থার ক্ষমতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি ও যুগোপযোগী করতে হবে। ৮। দেশের সকল নরমাল ডেলিভারী মিডওয়াইফদের মাধ্যমে সম্পন্ন করার সরকারী পরিকল্পনাটি সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত হলেও তা দীর্ঘমেয়াদী। এটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়ন দ্রæততর করতে হবে। অতিরিক্ত সি-সেকশন রোধে এটি একটি ভালো সমাধান কারণ যেহেতু মিডওয়াইফদের কাজ ও দক্ষতার সীমারেখা নরমাল ডেলিভারীতে সীমাবদ্ধ তাই অপ্রয়োজনীয় সি-সেকশনের জন্য তাদের কোন প্রকার বাড়তি প্রনোদনা বা ইনসেনটিভ থাকবেনা।

লেখক- চিকিৎসক, রিসোর্স পারসন, ডিএমপি-২।






Related News

Comments are Closed