Main Menu
শিরোনাম
কানাইঘাটে মামুনের লাশ কবর থেকে উত্তোলন         নবীগঞ্জে ট্রাক-অটোরিরিকশা সংঘর্ষে শিক্ষক নিহত         শ্রীমঙ্গলে একটি অজগর সাপ উদ্ধার         বাস বন্ধ করে সিলেটে পরিবহন শ্রমিকদের সমাবেশ, দুর্ভোগে যাত্রীরা         সিলেটে পল্লী বিদ্যুতের মিটার রিডাররা কর্মবিরতিতে         বিশ্বনাথে প্রবাসীর স্ত্রীর চুরির মামলায় বৃদ্ধ গ্রেফতার         কুলাউড়ায় মোটরসাইকেলের ধাক্কায় চা শ্রমিকের মৃত্যু         কনে ছাড়াই বাড়ি ফিরলেন বর         বিশ্বনাথে একই রাতে দুটি বাড়িতে ডাকাতি, আহত ১         সম্মেলন সফলে বাউল কল্যাণ সমিতির সভা         দুই বছরেও উদ্ধার হওয়া লাশের পরিচয় মিলেনি         বিশ্বনাথে রুমি হত্যাকারীর ফাঁসির দাবীতে মানববন্ধন        

মা আর ভাইয়ের বর্ণনায় লাদেনের জঙ্গি হয়ে ওঠা

প্রকাশিত: ৮:২০:২২,অপরাহ্ন ০৩ আগস্ট ২০১৮ | সংবাদটি ৫৬ বার পঠিত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদার সাবেক প্রধান নিহত ওসামা বিন লাদেনের মা আলিয়া ঘানেম ও পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর মুখ খুলেছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারা জানিয়েছেন কীভাবে লাদেন জঙ্গি হয়ে ওঠেন। তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে সিরিয়ায় কাটানো শৈশব থেকে শুরু করে আফগানিস্তানে সোভিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে তার মুজাহিদ জীবন। আর দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদক তুলে এনেছেন সৌদি আরবের যে আর্থসামাজিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতির মধ্যে ওসামা উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়েন।

আলিয়া ঘানেম ১৯৫০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে সৌদি আরব আসেন। ১৯৫৭ সালে রিয়াদে জন্ম হয় ওসামার। তিন বছর পর ওসামার বাবার সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় তার। পরে সবে যাত্রা শুরু করা বিন লাদেন সাম্রাজ্যের এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা আল-আত্তাসকে বিয়ে করেন আলিয়া। ওসামার বাবা ৫৪ সন্তানের জনক হন। তার অন্তত ১১ জন স্ত্রী ছিলেন।

ওসামার সৎভাইদের মাঝখানে বসে আলিয়া নিজের প্রথম সন্তান ওসামাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। তিনি জানান, লাজুক হলেও সে পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। ২০ বছরের দিকে সে শক্তিশালী, উদ্যমী ও ধার্মিক ব্যক্তিতে পরিণত হয়। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি বলেন, সে আমার কাছ থেকে অনেক দূরে ছিল, তাই আমার জীবন ভীষণ কঠিন ছিল। সে খুব ভালো ছেলে ছিল এবং আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসতো।

ওসামার মা সৎবাবা আল-আত্তাসকে দেখিয়ে জানান, তিন বছর বয়স থেকেই ওসামাকে বড় করেছেন তিনি। তিনি ভালো মানুষ এবং ওসামার কাছেও ভালো ছিলেন।

আলিয়া দাবি করেন, জেদ্দার কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময়েই ওসামা উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকেরাই তাকে বদলে দেয়। সে অন্যরকম মানুষে পরিণত হয়।

ওসামার মা জানান, সে যাদের সঙ্গে মিশেছিল তাদের একজন ছিল মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য আব্দুল্লাহ আজ্জাম। পরে এই ব্যক্তিকে সৌদি আরব থেকে নির্বাসিত করা হয়। কিন্তু ততদিনে সে ওসামার আধ্যাত্মিক পরামর্শকে পরিণত হয়েছে। আলিয়া বলেন, বিশ বছর পার হওয়ার প্রথম দিকে কিছু মানুষ তার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেওয়ার আগ পর্যন্ত সে ভালো ছেলে ছিল। ওই মানুষেরা নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য অর্থ পেয়েছিল। আমি তাকে সবসময় এদের কাছ থেকে দূরে থাকতে বলতাম। কিন্তু সে কখনোই আমাকে কিছু বলত না। কারণ, সে আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসতো।

১৯৮০ দশকের শুরুতে ওসামা আফগানিস্তানে পাড়ি জমান রাশিয়ার দখলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। ওসামার ভাই হাসান এই ঘটনার কথা তুলে ধরে বলেন, প্রথমদিকে যারাই তার সঙ্গে মিলিত হতো সবাই শ্রদ্ধা করত। শুরুতে আমরা সবাই তাকে নিয়ে খুব গর্বিত ছিলাম। এমনকি সৌদি সরকারও তাকে মহান ও শ্রদ্ধাশীল হিসেবে দেখত। এরপরই মুজাহিদ ওসামার আগমন ঘটে।

আলাপচারিতার এই পর্যায়ে ঘরের ভেতরে অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে আসে। ওসামার ধর্মান্ধ থেকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হিমশিম খান হাসান। বলেন, তিনি আমার বড় ভাই ছিলেন। আমি গর্বিত। তিনি আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন। কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে তাকে বিবেচনা করলে আমি নিজেকে গর্বিত মনে করি না। বৈশ্বিক পর্যায়ে তিনি খ্যাতি পেয়েছেন, কিন্তু এর ফলে কিছুই অর্জিত হয়নি।

দ্য গার্ডিয়ান প্রতিবেদককে হাসান যখন এসব কথা বলছিলেন তখন ওসামার মা কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। যখন ওসামার জঙ্গি হয়ে ওঠার দিনগুলোর কথা উঠে আসছিল তখন তিনি আবারও কথা বলা শুরু করেন। বলেন, সে ছিল সোজাসাপ্টা মানুষ। স্কুলে খুব ভালো করছিল, পড়তে পছন্দ করত। আফগানিস্তানে নিজের সব অর্থ ব্যয় করেছে। সে চাইলেই পরিবারের ব্যবসায় খুব সহজেই জীবনযাপন করতে পারতো।

ওসামা জঙ্গি হয়ে উঠতে পারে এমন আশঙ্কা করেছিলেন কখনও—এ প্রশ্নের জবাবে আলিয়া বলেন, আমার মাথায় এটা কখনো আসেনি। যখন বুঝতে পারলেন ওসামা জঙ্গি হয়ে উঠেছিলেন তখন অনুভূতি কেমন ছিল জানতে চাইলে বলেন, আমরা খুব হতাশ হয়ে পড়ছিলাম। আমি কখনো চাইনি এমনটা ঘটুক। সবকিছু সে কেন এভাবে ছুড়ে ফেলে দিলো?

জেদ্দাতে ওসামার জঙ্গি হয়ে ওঠার সময়কাল ছিল ১৯৭০-র দশক। ১৯৭৯ সালের ইরানের বিপ্লবের আগের সময় তা। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল সুন্নি আরব বিশ্বে শিয়া মতবাদ প্রচার করা। ওই সময় থেকে সৌদি আরবের শাসকরা সুন্নি ইসলামের কট্টরপন্থী ধারার প্রয়োগ শুরু করেন। ধর্মীয় নেতা মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাবের সময়ে ১৮ শতকে যা আরব পেনিনসুলায় অনুশীলন করা হতো। ১৭৪৪ সালে আব্দুল ওয়াহাব তৎকালীন সৌদি শাসক মোহাম্মদ বিন সৌদের সঙ্গে এক চুক্তিতে উপনীত হন। এতে করে রাষ্ট্রীয় বিষয় দেখাশোনা করার দায়িত্ব পান সৌদ পরিবার এবং কট্টরপন্থী মাওলানারা জাতীয় চরিত্র নির্ধারণের দায়িত্ব নেন।

১৯৩২ সালে সৌদি আরব আধুনিক রাষ্ট্রে রূপায়িত হয়। তখন মাওলানা ও শাসকদের প্রভাব এত বেশি ছিল যে কারও পক্ষে অন্যকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না। এর ফলে সৌদি রাষ্ট্র ও দেশটির নাগরিকরা এমন এক সমাজে চাপিয়ে দেওয়া হয় রক্ষণশীলতার জোয়াল। এরমধ্যে ছিল অনাত্মীয় নারী-পুরুষের সাক্ষাতে নিষেধাজ্ঞা, পুরুষের একাধিপত্য, অন্য মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং ধর্মীয় মতবাদের প্রতি অপরিবর্তনীয় আনুগত্য। এসব কিছুই সৌদ রাজপরিবারের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।

অনেকেই মনে করেন, রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের এই বন্ধন আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। আল-কায়েদার বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও ইসলামিক স্টেট (আইএস)-র দর্শনে ওয়াহাবি মতবাদের ছাপ রয়েছে। পুরো ১৯৯০’র দশকে সৌদি মাওলানাদের বিরুদ্ধে জিহাদি আন্দোলনকে উৎসাহিত করার অভিযোগ রয়েছে। আর এই সময়ে এই জিহাদি আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ওসামা বিন লাদেন।

১৯৯৯ সালে পরিবারের লোকজন ওসামার সঙ্গে সর্বশেষ সাক্ষাৎ করেছিল। ওই বছর কান্দাহারের কাছে একটি ঘাঁটিতে পরিবারের সদস্যরা দুইবার গিয়েছিলেন। ওই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে আলিয়া বলেন, ঘাঁটিটি ছিল বিমানবন্দরের কাছে এবং রাশিয়ার কাছ থেকে তা দখল করা হয়েছিল। আমরা যাওয়ায় সে খুব খুশি হয়েছিল। আমরা যতদিন ছিলাম সে সবকিছু ঘুরিয়ে দেখায় আমাদের। সে একটি পশু শিকার করে ভোজের আয়োজন করে। সবাইকে দাওয়াত দেওয়া হয়।

আলোচনার মোড় ওসামার শৈশবের দিকে আলোকপাত শুরু করায় আলিয়ার স্বস্তি ফিরে আসে। তিনি সিরিয়ার লাটাকিয়া শহরে শৈশবের স্মৃতিচারণ শুরু করেন। শিয়া অধ্যুষিত আলওয়াইতসের একটি পরিবারে বেড়ে ওঠেন তিনি। জানান, সৌদি আরবের তুলনায় সিরীয় খাবার সুস্বাদু এবং ভূমধ্যসাগরের কারণে জুন মাসে জেদ্দায় যে উষ্ণ আবহাওয়া থাকে সেটার বিপরীত অবস্থা ছিল সেখানে।

এ সময় আলোচনা থেকে পাশের কক্ষে চলে যান আলিয়া। ওসামার সৎভাই আলোচনা অব্যাহত রাখেন। তিনি জানান, ওসামার জঙ্গি জীবনের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না মা। ৯/১১ হামলার ১৭ বছর পার হলেও হামলায় ওসামা জড়িত, তা এখনও মেনে নিতে পারেননি মা। আহমেদ বলেন, মা তাকে (ওসামা) খুব ভালোবাসতেন এবং তাকে দায়ী করতে চান না। তিনি পরিস্থিতিকে দায়ী করতে চান। তিনি শুধু ছেলের ভালো দিক সম্পর্কে জানেন। আমরা সবদিক দেখেছি। কিন্তু তিনি তার জিহাদি দিক সম্পর্কে জানেন না কিছুই।

নিউ ইয়র্ক থেকে প্রথম যখন হামলার খবর শুনেছিলেন ওই সময়ের কথা জানিয়ে আহমেদ বলেন, আমি খুব আঘাত পাই, স্তব্ধ হয়ে যাই। খুব অদ্ভুত ধরনের অনুভূতি ছিল। আমরা শুরু থেকেই, প্রথম ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই জানতাম (হামলায় ওসামা জড়িত)। ছোট থেকে বড় সবাই লজ্জিত ছিলাম। আমরা সবাই জানতাম আমাদের ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সব দেশ থেকে পরিবারের সদস্যরা সৌদি আরবে চলে এলো।

সিরিয়া, লেবানন, মিসর ও ইউরোপে পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন জানিয়ে ওসামার সৎভাই বলে চলেন, সৌদি আরবে আমাদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো। তারা আমাদের পরিবারের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা করলো।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাদের সবাইকে কর্তৃপক্ষ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। একসময় তাদের দেশত্যাগে বাধা দেওয়া হয়েছে। দুই দশক পর লাদেন পরিবারের সদস্যরা এখন সৌদি আরব ও বিশ্বের অন্যত্র মুক্তভাবে চলাফেরা করতে পারেন।

উল্লেখ্য, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ভয়াবহ হামলায় প্রাণ হারিয়েছিল ২ হাজার ৭৫৩ জন। ঘটনার পরপরই সন্দেহের তীর আল কায়দার ওপর গিয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে নির্মম হামলাগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয় অস্বীকার করলেও ২০০৪ সালে হামলার দায় স্বীকার করে নেন আল কায়দা প্রধান ওসামা। পরে ২০১১ সালে মার্কিন সিল টিমের অভিযানে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে নিহত হন তিনি।






Related News

Comments are Closed