Main Menu
শিরোনাম
বয়সের কারণে আবারও বিশ্বনাথে বিয়ে ভঙ্গ         বিশ্বনাথে একই রাতে দুটি বাড়িতে ডাকাতি, আহত ১         সম্মেলন সফলে বাউল কল্যাণ সমিতির সভা         দুই বছরেও উদ্ধার হওয়া লাশের পরিচয় মিলেনি         বিশ্বনাথে রুমি হত্যাকারীর ফাঁসির দাবীতে মানববন্ধন         ওসমানীনগরে দু’পক্ষের সংঘর্ষে আহত ২০         কমলগঞ্জে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে তরুণীর মৃত্যু         বিয়ানীবাজারে অটোরিকশার ধাক্কায় বৃদ্ধের মৃত্যু         শাহ্ আরফিনে টাস্কফোর্সের অভিযানে পে-লোডার জব্দ         সিলেটে অগ্নিকান্ডে ৫টি দোকান ও ৩টি ঘর ভস্মিভূত         তামাবিল স্থল বন্দরে প্রশাসনিক ভবনের উদ্বোধন         সিকৃবিতে স্বয়ংক্রিয় কৃষি-আবহাওয়া স্টেশন স্থাপিত        

পদগত বেতন পার্থক্য নয়, এটা বেতন বৈষম্য

প্রকাশিত: ১২:১১:২১,অপরাহ্ন ২১ জানুয়ারি ২০১৮ | সংবাদটি ৩,৯২৬ বার পঠিত

স্বপন তালুকদার: সবকিছু দেখার বা বিবেচনা করার দৃষ্টিকোণ সবার এক রকম হবে না,হতে পারেও না।ভিন্নজন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিষয়কে দেখতে পারেন, দেখা সম্ভব।মানুষে মানুষে বিবেচনা, চিন্তা-চেতনায় ভিন্নতা নানা কারনে হতে পারে। অবস্থানগত কারনেও এইসবে মত পার্থক্য হওয়া স্বাভাবিক। সা¤প্রতিক সময়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন বৈষম্যের আন্দোলন নিয়ে জোরেসোরে বিভিন্ন মিডিয়ায় সমালোচনা আলোচনা হচ্ছে। যা শিক্ষা ও শিক্ষকদের জন্য শুভ লক্ষন হিসেবেই আমি দেখছি।এই আলোচনা সমালোচনার মাধ্যমেই প্রকৃত বিষয়টি সামনে আসবে। জাতির এসব বিষয় জানা দরকার।এসব আলোচনা যত বেশি হবে তা শিক্ষার জন্য শুভ দিক। যদিও দুই একজন বিশিষ্ট জন প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য নিরসনের দাবিকে বৈষম্য বলে মানতে নারাজ।উনাদের আলোচনাও উনাদের অবস্থান থেকে পেশ করেছেন। প্রধান শিক্ষক সমিতি সভাপতি একটি টিভি টকশো বলেছেন, এটা বৈষম্য নয়, এটা পদগত কারনে দুইটি পদের বেতন পার্থক্য। তা তিনি উনার অবস্থান থেকে বলতেই পারেন। কিন্তু একই ব্যক্তি যখন দুদিন পূর্বে সহকারী শিক্ষকদের অনশন কর্মসুচিতে সংহতি প্রকাশ করে আসেন তখন একটু খারাপ লাগবে এটাই স্বাভাবিক।কারন প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক একই পরিবারের সদস্য। তাছাড়া উনার আলোচনায় বেতন বৈষম্যের বা পার্থক্যের প্রকৃত ইতিহাস ও ধরণ ঠিক তুলে ধরেননি। উনি শুধু বর্তমানে শুরুর দিকের বেতন পার্থক্যের কথা বলেছেন। এটা তো প্রকৃত ইতিহাস বা তথ্য নয়। সহকারী শিক্ষক পদে প্রধান শিক্ষক পদের পরের ধাপে বেতন নির্ধারিত ছিল ১৯৮৫ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত। তার আগে পূর্বে তো দুইটি পদের মাঝে বেতনের কোন পার্থক্যই ছিল না,একই স্কেলে বেতন পেতেন। তবে সাবেক শিক্ষা সচিব জনাব নজরুল ইসলাম খান স্যারের আলোচনায় বর্তমানে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের পার্থক্যের প্রকৃত কারনটা তিনি সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন স্যারের ব্যাখ্যায়। তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন দুইটি পদে বেতনের পার্থক্য না থাকায় প্রধান শিক্ষক হতে শিক্ষকরা আগ্রহ দেখাত না।কথাটা যৌক্তিক এবং অনেকাংশে সত্য বটে,কিন্তু পুরো সত্য নয়। ৬৫ শতাংশ প্রধান শিক্ষক পদে সহকারী শিক্ষক থেকে পদোন্নতির কথার বিধান থাকলেও পদোন্নতি হয়না গত দশ বছর যাবৎ।অনেক সহকারী শিক্ষক পঁচিশ ত্রিশ বছর পদোন্নতির অপেক্ষায় থেকে একই পদে থেকে যাচ্ছেন অবসরে। এ বছর চলতি দায়িত্বে কোথাও কোথাও পদোন্নতি হলেও আগে পদোন্নতি হত স্ব-বেতনে। চলতি দায়িত্ব এবং স্ববেতনে দুটাই শুভংকরের ফাঁকি।তাছাড়া আছে নানা অনিয়ম আইনি জটিলতা। স্যার বৈষম্যের বিষয়ে আরও যুক্তি দেখিয়েছেন ব্রিটেনের সহকারী ও প্রধান শিক্ষক পদের বেতনের পার্থক্য টেনে। তিনি এশিয়ার বা বিশেষ করে উপমহাদেশের কোন দেশের বা আমাদের শিক্ষা ডিপার্টমেন্টের অন্যসব পদের বেতন পার্থক্যের উদাহরন টানলে অধিকতর যৌক্তিক হত। ব্রিটেন আর বাংলাদেশের শিক্ষাখাতে ব্যয়, শিক্ষকদের কার্য পরিধির বাস্তবতা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এক নয়। সেখানে একজন প্রধান শিক্ষক অন্য বিদ্যালয়েও দায়িত্ব পালন করে থাকেন অর্থাৎ একাধিক বিদ্যালয়ের। যা বলছিলাম,আমাদের দেশের শিক্ষকদের কার্য পরিধি ব্রিটেনের এক নয়। আমরা পদগত বা প্রসাশনিক এই প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের অন্য সব পদগুলোর দিকে যদি থাকাই, তবে বৈষম্য এবং পদগত বেতন পার্থক্যের বিষয়টি সুন্দরভাবে পরিষ্কার সম্ভব। সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকতা,উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এই পদগুলোতে প্রত্যক পদের বেতন পার্থক্য একধাপের দেখতে পাই। সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ১০ম ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ৯ম গ্রেড ক্রমান্বয়ে। এখানে তো কোন পদ তার আকর্ষন হারানোর কথা শুনিনি! আমাদের একজন শিক্ষক বিদ্যালয় বহির্ভূত অনেক কাজ করে থাকেন।তার মাঠ পর্যায়ের বেশির ভাগ কাজ একজন সহকারী শিক্ষক করে থাকেন।শ্রেণিকক্ষের বাইরে একাডেমিক অনেক কাজ তো আছেই।মেনে নিলাম বা মেনে নেওয়া হয়েছেও দুই পদের মাঝে বেতন স্কেলের পার্থক্য থাকা দরকার। তাই বলে তিনধাপের পার্থক্য হবে?যেখানে পদ দুটির মাঝে অন্য কোন পদ নেই। একই ডিপার্টমেন্টের অন্যসব পদে এমন কোন দৃষ্টান্ত নেই।
এখন আসা যাক বৈষম্য ও পার্থক্যের বিষয়ে।বৈষম্য শব্দটার সাথে বঞ্চনা থাকে। পদ দুইটির মাঝে অন্য কোন পদ নেই। একই প্রশিক্ষণ নিয়ে একই যোগ্যতায় চাকুরিতে প্রবেশ করে শুধু পদ দুটির কারনে তিনধাপের বেতন স্কেলের পার্থক্য কি বঞ্চনা নয়? যেখানে একজন সহকারী শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের বাইরেও অনেক কাজ করে থাকেন। তাছাড়া একটা দেশের জাতি গড়ার কারিগরদের জাতীয় স্কেলে অবস্থান ১৫তম ও ১৪তম গ্রেডে এবং চাকুরি জীবন শেষ করতে হয় ১২তম গ্রেডে। যেখানে একজন প্রধান শিক্ষকের চাকুরি জীবন শুরু দ্বিতীয় শ্রেণির পদ মর্যাদা নিয়ে। সেখানে এখন সহকারী শিক্ষক যাকে কিনা শিক্ষার উন্নয়নে প্রকৃত কাজ শিক্ষাদানটা করে যান সারাজীবন! এটা কি বঞ্চনা বা বৈষম্য নয়?টিভি চ্যানেল দুটির আলোচকদের আলোচনা আমার কাছে একপেশে মনে হয়েছে। উনারা শিক্ষার প্রকৃত যে কাজ যিনিরা করে থাকেন উনাদের কাজকে ততটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেননি। শুধু প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনায় নিয়েছেন।শিক্ষকতা অন্যসব পেশা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। অন্যসব পেশার সাথে গুলিয়ে ফেলা যায় না, এখানে প্রসাশনিক সফলতা দিয়ে সবটা হয়ও না। আরও একটা বিষয় না বললেই নয়, তা হলো আমাদের জাতীয় বেতন কাঠামোর ১:১০ এ ধাপ বিন্যস্ত। ২০ টি ধাপ ১: ১০ এ সাজানো হয়েছে। যা মান্ধাতার আমলের প্রাগৈতিহাসিক আমলাতান্ত্রিক। ২০তম ধাপ থেকে ১১তম ধাপ পর্যন্ত ১০টি ধাপে বেতন ব্যবধান রাখা হয়েছে মাত্র ৪ হাজার ২৫০ টাকার এবং ১১তম গ্রেডের পরবর্তি ধাপগুলো ব্যবধান যা বলাবাহুল্য। আমরা মানুষে মানুষে শ্রেণি বৈষম্য কমানোর কথা বলি। আর প্রজাতন্ত্রে শিক্ষিত স¤প্রদায়ের মাঝে যদি ২০টি ধাপের বেতন স্কেল বৈষম্য সৃষ্টির প্রক্রিয়া স্বাধীনতার এত বছরও অব্যাহত থাকে, তাকে কি বলা যায়! আর জাতীয় বেতন স্কেলের চরম ঘন গ্যাঞ্জামেই সহকারী শিক্ষকদের দুটি ধাপ পেরিয়ে বিদায়। যা সত্যি জাতির জন্য লজ্জাজনক।সুতরাং এই পার্থক্য পদগত কারনে নয়, এটা স্রেফ বেতন বৈষম্য। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহকারী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকদের মাঝে কোন বেতন পার্থক্য রাখেনি। তখন প্রধান শিক্ষক পদে একটি দায়িত্ব ভাতা পেতেন।আমি বলছি না যে প্রধান শিক্ষক পদটির গুরুত্ব নেই। তবে এ কথা তো সত্য সহকারী শিক্ষকরাই মাঠ পর্যায়ের শিক্ষাদানসহ যাবতীয় কাজ সফলতার সাথে নিষ্পন্ন করে থাকেন। আমি বলব দুটি পদেই সমান গুরুত্ববহ। একটি অপরটির পরিপুরক এবং প্রধান শিক্ষক পদের অবশ্য বেতন সহকারীদের বেতন থেকে বেশি হওয়া উচিত। নতুবা এই পদটি আকর্ষন হারাবে। তারমানে এই নয় যে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন পার্থক্য তিনধাপের হবে। যদি তাই হয় তবে থাকে বৈষম্যই বলতে হয়। সহকারীদের দাবি প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের পরের গ্রেডে সহকারী শিক্ষকদের বেতন নির্ধারন যৌক্তিক বলেই আমি মনে করি। তাছাড়া গত চার বছরে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক সংগঠন গুলোর নেতৃবৃন্দ সরকারের বিভিন্ন মহলে সভা, সমাবেশ, স্মারকলিপি, মানববন্ধন এবং সৌজন্য সাক্ষাৎ করে তুলে ধরেছেন এবং সহকারী শিক্ষকদের দাবি যৌক্তিক বলিয়া মনে করেছেন। মাননীয় অর্থমন্ত্রী ২০১৫ বেতন বৈষম্য নিরসন কমিটির এক টিভি সাক্ষাৎকারে তিনি প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের মাঝের বেতন পার্থক্য অনেক বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বৈষম্য নিরসন কমিটিতে উপস্থাপন করে বৈষম্য নিরসন করা উচিত বলেছেন। যা ২০১৫ তে বৈষম্য নিরসন কমিটিতে আলোর মুখ কেন দেখেনি তা বলা মুশকিল। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বৈষম্যের সন্তোষজনক সমাধান হলেও, প্রাথমিক সহকারীদের আবেদন অবহেলিতই থেকে যায়। এখানেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছিল কিনা? তাই বিষয়টি বর্তমান শিক্ষা বান্ধব সরকারের মাননীয় প্রধানমমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষনে গত ডিসেম্বরে ২৩ থেকে অনশনে যান শিক্ষক মহাজোট। তৃতীয় দিনে মাননীয় প্রাথমিক ও গণ শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাসে সহকারী শিক্ষক মহাজোট অনশন স্থগিত করেন।তিনি আশ্বস্ত করেন একমাসের মাঝেই কোন প্রকারের বৈষম্য তা দেখে আলোচনার মাধ্যমে এ বৈষম্য নিরসন করবেন।কিন্তু একটি মহল শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবিকে ভুল ও মিথ্যা তথ্য মিডিয়ায় প্রচার করে ভিন্নখাতে প্রবাহের চেষ্টা করে। যা সত্যি দু:খজনক। যদিও আশ্বাসের পর প্রায় একমাস হতে চলল, কোন আলোচনা এখনও হয়নি তবু আমরা আশাবাদী সহকারী শিক্ষকদের নিরাশ করবেন না। বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকার শিক্ষার উন্নয়নে অনেক ইতিবাচক কাজ করে যাচ্ছেন। পাঁচ বছর পূর্বে ছাব্বিশ হাজার বিদ্যালয় জাতীয়করন করেন।সহকারীদের বেতন বৈষম্য নিরসন করে মাঠ পর্যায়ে অসন্তোষ দুর করে শিক্ষকদের হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে দিবেন দ্রুততম সময়ের মধ্যই। আমি মনে করি প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দুর করা জরুরি। প্রাথমিক শিক্ষা শিক্ষার ভিত্তি। প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সেই ভিত্তি মজবুতের আসল কারিগর। তাঁদের অসন্তোষ দুর করা জরুরি। পদগত পার্থক্য বা অন্যকোন অজুহাতে সহকারী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক পদের বেতন বৈষম্য জিইয়ে রাখা হবে সহকারী শিক্ষকদের সাথে বিমাতা সুলভ আচরণ। যা হবে মান সম্মত শিক্ষার জন্য প্রধান অন্তরায়। আমি আশা করি বর্তমান শিক্ষা বান্ধব সরকার দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদাসহ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের বেতন প্রশিক্ষক প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পরের গ্রেডে বেতন স্কেল পুন:নির্ধারণ হবে শিক্ষকদের বেতন বৈষম্যের স্থায়ী সমাধান। যা হবে শিক্ষার জন্য সময়োপযোগী যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট।






Related News

Comments are Closed