সর্বশেষ
সিলেটে বৈধ ১২টি হাটে পশু বেচাকেনা         বিশ্বনাথে ২২টি গরু চুরির ঘটনায় মামলা         সিলেটে পিকআপ উল্টে চালক ও হেলপারের মৃত্যু         বিশ্বনাথে কুরবানির পশুর হাটে ক্রেতা-বিক্রেতা কম         ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটুক্তি, প্রবাসী গ্রেফতার         গোলাপগঞ্জে ব্যবসা প্রতিষ্টানে চুরি, ১০ লক্ষ টাকার মাল লুট         ছাতকে তিন সন্তানের জননীর আত্মহত্যা         জকিগঞ্জে স্কুলছাত্রীর শ্লীলতাহানী, প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ         হবিগঞ্জ পানিতে ডুবে তিন শিশুর মৃত্যু         ফেইসবুকে অশ্লীল ছবি প্রকাশ, ৩ বখাটে জেলে         শ্রীমঙ্গলে হাতি দিয়ে চাঁদাবাজী, আতংকে মানুষ         বন্যায় ভেঙ্গে গেছে বালাগঞ্জের আজিজপুর সড়ক        

আজ বই উৎসব

বৈশাখী নিউজ ২৪ ডটকম । প্রকাশিতকাল : ১১:৫৭:২২,অপরাহ্ন ০১ জানুয়ারি ২০১৮ | সংবাদটি ২৬১ বার পঠিত

জিয়া খালেদ: আজ ১লা জানুয়ারি ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ। ইংরেজি নববর্ষের ১ম দিন। দেশব্যাপি আজ বই উৎসব। উৎসব মুখর পরিবেশে বই বিতরণ শুরুর মধ্য দিয়ে নববর্ষের সূচনা। সকলকে নববর্ষের শুভেচ্ছা। বই জ্ঞানের ভান্ডার। আনন্দের আরেক নাম বই। জ্ঞান এবং আনন্দ এ দু’য়ের অভাব পূরণ করে বই। সুন্দরের উপলব্ধি সত্যবোধ, নতুন অনুভুতির জন্ম দেয় বই। জীবনে তিনটি জিনিষের প্রয়োজন বই, বই এবং বই।
আজ নতুন বইয়ের গন্ধ শুকে, নতুন বই বুকে জড়িয়ে, নতুন বছরের নতুন দিনে, নতুন ক্লাসের আনন্দে মাতোয়ারা এদেশের শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা। দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে সপ্তাহ ব্যাপি এ উৎসব চলবে। সময়ের বিবর্তনে নববর্ষের সাথে সম্পর্কিত অনেক আচার অনুষ্ঠান হারিয়ে যাচ্ছে ঠিকই, একই সাথে যুক্তও হচ্ছে বই উৎসবের মত বহু নতুন আয়োজন। বই দিয়ে শিক্ষার্থীদের এবং তাদের অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা, অর্থচিন্তা অনেকটা দূর হয়েছে। ঝরেপড়ার হারও অনেকটা কমছে। এত বিপুল সংখ্যক বই নির্ভুল ভাবে ছাপা করে বৎসরের প্রথম দিনে ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে পৌছানো কঠিন কাজ। তারপরও বিগত বছরগুলোতে সরকার এ কাজে সফল। বছর শেষে বার্ষিক পরীক্ষা, পাবলিক পরীক্ষায় কাঙ্খিত সাফল্যের আত্মহারা শিক্ষার্থীরা পরবর্তী বছরের প্রথম দিনে নতুন বই হাতে পেয়ে বাঁধ ভাঙ্গা উচ্ছাসে মেতে উঠে তারা, এমনকি তাদের শিক্ষক-অভিভাবকরাও। অভিভাবকদের মধ্যে আরো থাকে পরিতৃপ্তি।
বই দেয়া হয়, বই দেয়া হচ্ছে, বই দেয়া হবে। কিন্তু বই পড়া হয় না, বই পড়া হচ্ছে না, বই পড়ানোও হয়না। বই ঠিকমত পড়ানো হবে কিনা জানি না। কারণ উৎসবের মাঝে আমরা আমাদের জীবনকে আষ্টে, পৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছি। ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সকল শিক্ষার্থীই তাদের পাঠ্য বই পড়ে মেপে মেপে। শুধুমাত্র জিপিএ পেতে কিংবা পাশ করতে। শেখার জন্য তারা বই পড়ে না, শেখার জন্য তাদের পড়ানোও হয় না। কেবল মাত্র রেজাল্ট ভাল করার জন্য পড়া কিংবা পড়ানো। শিক্ষক শিক্ষার্থী প্রায় সবাই কোচিংমুখী। শ্রেণিভিত্তিক অর্জন উপযোগী যোগ্যতা অর্জনে শিক্ষার্থীরা ব্যর্থ। এ জন্য একক ভাবে শিক্ষার্থীদের দায়ী করা যায় না। দায়ী শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষক ও অভিভাবকরাও। তা ছাড়া শিক্ষকদের জন্য শ্রেণি কক্ষে পাঠদানের যে কর্মঘন্টা নির্ধারিত, অনেক সময় সে সময়টুকুও তারা পাঠ দানে ব্যয় করতে পারেন না। তাদের সময় ব্যয় করতে হয় অন্যান্য কাজে। যেমন- উপবৃত্তির কার্ড তৈরী, কার্ড ইস্যু, উপবৃত্তি আদান-প্রদান, স্টুডেন্ট কাউন্সিল গঠন, নির্বাচন ইত্যাদি সহ নানা দাফতরিক কাজে। তাছাড়া শিক্ষক স্বপ্লতা তো আছেই।
সরকারি ভাবে এক সময় শিক্ষকদের জন্য শুধু সি-ইন-এড প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। এখন দেড় বছর মেয়াদী ডিপিএড সহ নানা খন্ডকালীন প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা রয়েছে। সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে নানা সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু এ সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগছে না। শিক্ষার গুণগত মান রাড়াতে এ সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য একাডেমিক সুপারভিশন জোরদার করা একান্ত প্রয়োজন। প্রাথমিকে মাঠ পর্যায়ে একাডেমিক সুপারভিশন পরিচালনা করেন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসারগণ। ক্লাস্টার কর্মকর্তা হিসাবেও তারা একাডেমিক তত্ত¡াবধান, প্রশাসনিক যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালনা এবং ক্লাস্টার, সাব-ক্লাস্টার ট্রেনিং সহ বিভিন্ন ট্রেনিংএ তারা শিক্ষকদের প্রশিক্ষক হিসাবেও কাজ করেন। এ দায়িত্ব দক্ষতার সাথে পালনের জন্য জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) থেকে তারা প্রশিক্ষণও নেন।
এ সমস্ত প্রশিক্ষণ কোর্সে বড় বড় কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে দিক নির্দেশনা মূলক বক্তব্যে প্রশিক্ষণার্থীদেরকে তাদের পেশাগত দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালনের পরামর্শ দেন। বতর্মান প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা অনেক উন্নত, আধুনিক। তাছাড়া প্রশিক্ষণে যারা সংশ্লিষ্ট অর্থাৎ প্রশিক্ষক, প্রশিক্ষনার্থী, ভিজিটর সহ সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমান সম্মানীর খামও থাকে। বেতনও বাড়ানো হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। তারপরও আমাদের শিক্ষারমান বাড়ছেনা, কেন জানিনা? ভার্সিটিতে লেখাপড়া করছে “হাউ, হাউ ফিলিংস” মার্কা শিক্ষার্থীরা। গত কয়েক বছর আগে বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রফেসর আসাদুজ্জামান একটি নামকরা বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে এক ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন বলতো বাবা “আমার শরীর কেমন কেমন করছে” ইংরেজি কি? খুব স্মার্ট ছেলেটি উত্তর দিয়েছিল- “মাই বডি নোজ হাউ হাউ ফিলিংস”। পাঠক, আপনি যান, প্রশ্ন করুন, এমনি উত্তর পাবেন আমাদের ভার্সিটি পড়–য়া বেশিরভাগ সোনামণি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। এরা বই পড়ে না, শিখে না। এরাইতো এক সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ম শ্রেণি থেকে ভার্সিটি পর্যন্ত বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ধান্ধায় থাকবে, ঘুষ খাবে, অসামাজিক, দেশদ্রোহী কার্যকলাপে লিপ্ত থাকবে, আকাম, কু-কাম করবে। প্রশ্নপত্র ফাঁস করতে করতে এবার পরীক্ষার ফলাফলও ফাঁসের শুভ উদ্বোধন হয়েছে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের ৫ম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল ফাঁসের মধ্য দিয়া। এ ঘটনায় ২ জন শিক্ষক সহ ৬ জনকে দায়ী করে মামলা করা হয়েছে। ১ জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সদরঘাট থানায় মামলা নং ২৩/২০১৭।
সব সরকারই অন্ততঃ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য হলেও জনস্বার্থে কিছু কাজ করে। শত বিতর্ক থাকলেও বর্তমান সরকারেরও কিছু অর্জন আছে। সরকারের সব অর্জন ঘরে তোলা যাচ্ছে না কিছু মেরুদন্ডহীন অসাধু, চাটুকার, বাটপার কর্মকর্তাদের জন্য। যেমন ধরুন, বর্তমান সরকার উপজেলা পর্যায়ে ১টি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় ৮ম শ্রেণিতে উন্নীত করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালের মার্চে দেশের ৪৯১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণি চালু করার নির্দেশ দেন। উক্ত বিদ্যালয় সমূহে জন্য পদ সৃজন সহ অতিরিক্ত জনবল পদায়িত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি বিদ্যালয়ে ২ জন করে বি.এড শিক্ষক পদায়নের নির্দেশ দেন, যার স্মারক নং- প্রাশিঅ/৫পি-৫০/ বিদ্যা-ঢাকা/ ২০১০/ ১২৯ (৬৪)(৮) তাং ১০ মার্চ ২০১৩ খ্রি:। মহাপরিচালকের নির্দেশ মত দেশের সব ক’টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বি.এড শিক্ষক পদায়ন করা হয়েছে কি-না জানিনা, তবে এ পর্যন্ত পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলেও সিলেট জেলাধীন ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পাঠানচক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোন বি.এড শিক্ষক পদায়ন করা হয়নি। ৫ম শ্রেণির স্থলে ৮ম শ্রেণি চালু, কমপক্ষে অতিরিক্ত ৩টি শ্রেণি কক্ষের দরকার, একটি শ্রেণি কক্ষও নির্মাণ করা হয়নি। তারপরও বিগত বছরগুলোতে জে.এস.সি পরীক্ষায় উক্ত বিদ্যালয়ের ফলাফল শতভাগ পাশ।
কোন কোন বিদ্যালয়ে শ্রেণিক্ষক সংকট, শিক্ষক সংকট রেখে কোন কোন বিদ্যালয়ে দেয়াল নির্মাণ গেইট নির্মাণ, বাদ্যযন্ত্র সরবরাহ ইত্যাদি শিক্ষার বারোটা বাজানোর আয়োজন ছাড়া কিছুই নয়।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্যও সুসংসাদ (?) আছে, তবে এটা জাতির জন্য দুঃসংবাদও বটে। ১ হাজার ১১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩৬টি বিদ্যালয়ে চলন্ত সিঁড়ি (এস্কেলেটর) বসানো হবে। একনেকে প্রকল্পটি পাশও হয়েছে। যেখানে এখনও শত শত স্কুল ভবন জরাজীর্ণ, শিক্ষা উপকরণ অপর্যাপ্ত, সেখানে চলন্ত সিঁড়ি? এ প্রসঙ্গে একটা প্রভাবশালী পত্রিকা লিখেছে- “এ হচ্ছে লুঙ্গির সাথে টাই পরে ভদ্রলোক সাজা, …. এ প্রকল্প চলমান দুর্নীতির অনন্য দৃষ্টান্ত।” বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সিঁড়িগুলো অকেজো হয়ে যেতে পারে। দাম্ভিককের দম্ভ আল্লাহ বরদাস্ত করেন না। সৌদি বাদশাহ রাশিয়া সফরে যেতে সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন বিমান থেকে নামার জন্য সোনার তৈরী চলন্ত সিঁড়ি। ব্যবহার করতে পরেননি। সিঁড়ি বিকল হয়ে গিয়েছিল। বিকল্প ব্যবস্থা বিমান থেকে নামতে হয়। কাজেই কোন কাজে বাড়াবাড়ি না করাই ভাল।
প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ হচ্ছে শিশুদের দৈহিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক, দেশাত্মবোধ, বিজ্ঞান মনস্কতায়, সৃজনশীলতায়, মানবিক এবং নান্দনিক বিকাশ সাধন করা এবং তাদেরকে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করা। প্রাথমিক শিক্ষার এ লক্ষগুলো কি শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায় বাস্তবায়ন সম্ভব? না। তা বাস্তবাযন করতে হবে শিক্ষা জীবনের প্রতিটি স্তরে এমন শিক্ষকদের সান্নিধ্যে থেকে যে শিক্ষক জ্ঞান দক্ষতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির নিরিখে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাদের প্রত্যাশিত চাহিদা পূরণে সচেষ্ট। শিক্ষকরা যদি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই সঠিক নিয়মে পড়ান তবে তাদের নোট বই, গাইড ইত্যাদি পড়তে হবে না। তাদের বই পড়ার অব্যাস গড়ে উঠবে এবং একই সাথে তারা তাদের শিক্ষার লক্ষ অর্জনের দিকে এগিয়ে যাবে।
শিক্ষার মান বাড়াতে চাই মানসম্মত শিক্ষক। এমন শিক্ষকের আকাল বাংলাদেশে। সাহিত্য চর্চা ছাড়া, বই পড়া ছাড়া মানসম্মত শিক্ষক কল্পনা করা যায় না। আগে বিয়ে সাদীতে বই উপহার দেয়া হত। এখন উপহার হিসাবে বই উদাও। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে ১৯২৫ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে আমাদের স্বাক্ষরতার হার ছিল ১০ থেকে ১২ ভাগ। ঐ ১০ থেকে ১২ ভাগ জনগোষ্ঠি কোন না কোন ভাবে সাহিত্য চর্চার সাথে জড়িত ছিলেন। এখন শিক্ষিতের হার শতকরা আশি ভাগের বেশি। এখানে সাহিত্য চর্চার হার ১০ – ১২ থেকে কমে ৩ – ৪ ভাগ হবে কিনা সন্দেহ।
পবিত্র কুরআনের বাণী- “পড় তোমার প্রভূর নামে”। পবিত্র হাদিসেও একই ধ্বনি- “শিক্ষাকাল দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত”। পারস্যের কবি ওমর খৈয়াম বলেছেন, “মদ-রুটি ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে কিন্তু বই রয়ে যাবে অনন্ত যৌবনা”।
আসুন আমরা বই পড়ি, সাহিত্য চর্চা কবি। সুন্দর পবিত্র জীবনের অধিকারী হই। আমিন।
লেখক- কলামিষ্ট, সভাপতি- ফেঞ্চুগঞ্জ প্রেসক্লাব।






Comments are Closed